বিদেশি ঋণের সুদ ৮ বছরে পাঁচ গুণ, এই দেনা শোধ হবে কীভাবে? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিদেশি ঋণের সুদ বাড়ছে, বাড়ছে দেনা পরিশোধের চাপ। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না সরকারের রাজস্ব আয়। ফলে পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে ক্রমেই চাপে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

 

মাত্র আট বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের গড় সুদের হার বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। ২০১৬ সালে যেখানে এই হার ছিল শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশের নিচে, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে।

অন্যদিকে, এক দশক ধরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত আটকে আছে সাত দশমিক পাঁচ থেকে আট দশমিক পাঁচ শতাংশের মধ্যে।

অর্থাৎ, ঋণের খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো রাজস্ব সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সহজ শর্তে ঋণ ও অনুদান পাওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট বা বিএফটিআইয়ের তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বৈদেশিক ঋণের গড় সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক আট থেকে এক শতাংশ। ২০২০ ও ২০২১ সালে তা বেড়ে প্রায় এক দশমিক দুই শতাংশ হয়। ২০২২ সালে এই হার দাঁড়ায় এক দশমিক আট শতাংশে। ২০২৩ সালে দুই দশমিক তিন এবং ২০২৪ সালে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছায়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৫৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ৪৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরেই বেড়েছে ৫ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা, যা প্রায় ১১ দশমিক তিন শতাংশ।

কিন্তু কেন বাড়ছে বিদেশি ঋণের খরচ?

বিএফটিআইয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। অস্থিরতা দেখা দিয়েছে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোয় ব্যয়বহুল হয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণও।

এর পাশাপাশি বদলাচ্ছে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন নীতি। জার্মানির কাছ থেকে পাওয়া কিছু সহায়তা এখন অনুদানের বদলে ঋণ হিসেবে আসছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণের শর্তও আগের তুলনায় কঠিন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নেও অনুদানের পরিবর্তে ঋণনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণে। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি কর আদায়। ফলে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি পুরোনো ঋণ শোধের দায় মেটাতে সরকারকে বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে।

রাজস্ব না বাড়লে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এমনকি পুরোনো ঋণের দায় মেটাতে নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতাও বাড়তে পারে।

এর মধ্যে নতুন উদ্বেগ এলডিসি উত্তরণ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, বৈদেশিক অনুদান এবং সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান মনে করেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য স্পষ্ট নয়।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএফটিআই স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে। স্বল্পমেয়াদে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কর-বহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদে সরকারি- বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি সম্প্রসারণ, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সতর্কতা এবং শুল্ক ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরীর মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয় এবং সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সরবরাহব্যবস্থা ও সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু বিদেশি ঋণ পরিশোধ নয়, বরং ঋণনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো। রাজস্ব সংস্কার, দক্ষ সরকারি ব্যয় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা না গেলে, বাড়তি ঋণের সুদ ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি