ইউরোপে ক্ষোভের বিস্ফোরণ, কাঠগড়ায় সরকার! (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: উন্নত জীবন, ভালো শিক্ষা আর নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন-ইউরোপের এই পরিচিত ছবিটাই এখন প্রশ্নের মুখে! কোথাও আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, কোথাও জ্বালানির বাড়তি খরচ, আবার কোথাও শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা। ক্ষোভে রাস্তায় নেমেছেন লাখো মানুষ। ফ্রান্সে বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে ব্যাপক সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে। স্পেনে আবাসন সংকট ঘিরে তৈরি হয়েছে আগাম নির্বাচনের পরিস্থিতি। প্রশ্ন হলো-ইউরোপের মানুষের ক্ষোভ কি কেবল পকেটের টান, নাকি রাষ্ট্রের ওপর আস্থারও সংকট?

এই ক্ষোভের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ দেখা গেছে ফ্রান্সে। ১৭ অক্টোবর, দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। আয়োজকদের দাবি, সংখ্যাটি আট লাখের কাছাকাছি।

 

তবে আন্দোলনের শুরুটা শুধু জ্বালানির দাম কিংবা দ্রব্যমূল্য নিয়ে নয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ শুরু করেন শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, দীর্ঘ সময়ের ক্লাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ থেকে। পরে সেই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি ও সরকারি সেবার প্রশ্ন।

১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের একপর্যায়ে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ১৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো টাউন হলও আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় আটক ও আহতের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে হালনাগাদ তথ্য এসেছে।

সরকারি হিসাবে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় আরও তিন হাজার খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছু ফি বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—তাৎক্ষণিক ছাড় দিয়ে কি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থামানো সম্ভব?

স্পেন - একটি উচ্ছেদ, জাতীয় আবাসন সংকটের প্রতীক

ফ্রান্সে ক্ষোভের কেন্দ্রে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়। আর স্পেনে আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা- মারিয়া দেল কারমেন আবাসকাল।

মাদ্রিদে দীর্ঘদিনের বাসা থেকে উচ্ছেদের মুখে পড়েন তিনি। একটি বিনিয়োগ তহবিল বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়ানোর পর সেই ব্যয় বহন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুসপ্তাহ পর মারা যান তিনি। তার ঘটনা দেশটির আবাসন সংকট নিয়ে চলমান ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে।

স্পেনে গত এক দশকে বাড়িভাড়া প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে। তরুণদের জন্য নিজের উপার্জনে আলাদা বাসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে রয়েছে স্বল্পমেয়াদি পর্যটক ভাড়া, সম্পত্তিতে বিনিয়োগের চাপ এবং আয়ের সঙ্গে আবাসন ব্যয়ের অসামঞ্জস্য।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষা ও উচ্ছেদ ঠেকাতে জরুরি আবাসন আইন পাসের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর বাধায় সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এরপরই তিনি ২৯ নভেম্বর আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

অর্থাৎ, আবাসন সংকট এখন শুধু সামাজিক প্রতিবাদের বিষয় নয়-স্পেনে তা সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রেও চলে এসেছে।

পর্তুগাল ও ইতালি-আয় বাড়ে না, খরচ থামে না

একই বাস্তবতার আরেক চিত্র পর্তুগালে। ১৭ অক্টোবর রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেন। দাবি-বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বেশি মজুরি, পেনশন বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এ কারণে, চাকরি থাকলেও বড় শহরে বাসা নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভের চাপে নতি স্বীকার না করার বক্তব্য এলেও সংকটের সমাধান নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে।

ইতালির মিলান ও বোলোনিয়াতেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও মিলানে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-সব বিক্ষোভ একই সংগঠনের নেতৃত্বে হয়নি। দেশভেদে দাবি আলাদা হলেও মানুষের ক্ষোভের জায়গাগুলোতে মিল রয়েছে।

বেলজিয়াম - শিক্ষার ব্যয়ও ক্ষোভের কারণ

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফি ও শিক্ষার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের পাশাপাশি ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

ফ্রান্সের মতো এখানেও শিক্ষা ব্যয়ের প্রশ্নটি বৃহত্তর জীবনযাত্রার সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যখন পরিবারের খরচ বাড়ে, কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়ে না, তখন উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।

তাহলে ইউরোপজুড়ে এই ক্ষোভের গভীরে কী রয়েছে?

প্রথমত, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান। বাড়িভাড়া, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের চাপে মানুষের হাতে সঞ্চয়ের সুযোগ কমছে।
 
দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। শিক্ষার মান ও সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করছে-পড়াশোনা শেষ করে কি তারা নিরাপদ জীবন গড়তে পারবেন?

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক আস্থার সংকট। মানুষ যখন মনে করে, তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না, তখন সেই অসন্তোষ নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

তবে এটিও মনে রাখতে হবে-সব বিক্ষোভকারী সহিংসতায় জড়িত নন। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আর ভাঙচুর এক বিষয় নয়। আর কয়েকটি দেশের ঘটনাকে পুরো ইউরোপের অভিন্ন বিপ্লব বলারও সুযোগ নেই।

ইউরোপের সংকট: শুধু অর্থনীতি নয়, আস্থারও পরীক্ষা

ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানো নয়; বরং মানুষের নাগালের মধ্যে আবাসন, মানসম্মত শিক্ষা ও সহনীয় জীবনযাত্রার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রশ্নটা খুব সাধারণ—কাজ করেও যদি বাসাভাড়া মেটানো কঠিন হয়, পড়াশোনা করেও যদি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকে, তাহলে উন্নয়নের সুফল পৌঁছাচ্ছে কার কাছে?  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি