বাংলাদেশের সংকট কতটা গভীর?

ক্রীড়া প্রতিবেদক: একটি দল ৫০ ওভারের ম্যাচে ৩৪ ওভারও ব্যাটিং করতে পারছে না। আরেক ম্যাচে ফাইনালে ওঠার সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ১৬০ রানেই গুটিয়ে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ভারত কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা নয়; জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তান। তবু তাদের বিপক্ষেই এমন অসহায় আত্মসমর্পণ বাংলাদেশের। প্রশ্নটা তাই শুধু হারের নয়, ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের শক্ত ভিতটা কোথায় হারিয়ে গেল, সেটিরও!

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ড্র করলেও ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। এই ব্যর্থতার পেছনে প্রথম ধাক্কা ছিল অধিনায়ক লিটন দাসের অনুপস্থিতি। চোটের কারণে পুরো সিরিজ থেকে ছিটকে যাওয়ায় নেতৃত্বের দায়িত্ব পান তাওহিদ হৃদয়। লিটনের অভাব শুধু অধিনায়কত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মিডল অর্ডারেও তার অভিজ্ঞতা হারিয়েছে দল। তবে একজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতিকে পুরো ব্যর্থতার কারণ বলা যাবে না। কারণ, সমস্যাগুলো বেশ পুরোনো।

বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারের দিকে তাকালেই একটি দুর্বলতা চোখে পড়ে। প্রথম ৬ ব্যাটসম্যানের মধ্যে হৃদয় ছাড়া বাকিদের ওপেনিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। টপ অর্ডারে খেলোয়াড়ের অভাব না থাকলেও প্রকৃত মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের ঘাটতি স্পষ্ট। শুরুতে উইকেট পড়ে গেলে ইনিংস পুনর্গঠনের দায়িত্ব যাদের নেওয়ার কথা তাদের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮ নম্বরে পেসার শরীফুল ইসলামের ব্যাটিংয়ে নামাও ব্যাটিংয়ের গভীরতার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।

সমস্যার আরেকটি বড় জায়গা জুটি গড়তে না পারা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২৭ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর সাইফ হাসান ও পারভেজ হোসেন ইমন ৯৩ রানের জুটি গড়েছিলেন। সেটিই ছিল ম্যাচে বাংলাদেশের একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বোচ্চ জুটি ছিল মাত্র ৪৭ রানের। দুই ম্যাচে ৫০ রানের বেশি জুটি হয়েছে একবারই। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে যেখানে বড় সংগ্রহের ভিত্তি তৈরি হয় একাধিক কার্যকর জুটিতে, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটিং নির্ভর করছে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশ যেন ৫০ ওভারের ক্রিকেটের মূল চাহিদাটাই ভুলে যাচ্ছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭২ রান তাড়া করতে নেমে ৩৩.৪ ওভারে অলআউট হয়েছে দল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ফাইনালে যেতে অন্তত ৪১ রানে জিততে হতো। অথচ ১.৩ ওভারে ৬ রানে দুই উইকেট হারানোর পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দল। ৫২ বল বাকি থাকতেই শেষ হয়েছে ইনিংস। চাপের মুখে উইকেট ধরে রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও দেখা যাচ্ছে না।

প্রতিপক্ষের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টানা ৪ ওয়ানডেতে হেরেছে বাংলাদেশ। আমিরাতে সর্বশেষ সাত ম্যাচে জয় মাত্র একটিতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও সর্বশেষ সাত ম্যাচে জয় দুটি। ফলে দল দুটিকে এখন আর ছোট প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই।

ব্যর্থতার পর হৃদয়ও আত্মসমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বড় কোনো সিরিজ, ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপে যখন খেলতে যাই, ব্যক্তিগতভাবে এবং দল হিসেবে সবাই ট্রফি জিততে চাই। কিন্তু আমরা শুধু মুখেই বলি, কাজে সেটার প্রতিফলন দেখা যায় না।’

ব্যাটিং ইউনিটের ব্যর্থতা নিয়ে তার বক্তব্য, ‘একটা জায়গা নিয়ে বলতে চাচ্ছি না; কারণ, ব্যাটিং ইউনিট পুরাটাই একসঙ্গে ব্যর্থ হয়েছি। পাইপলাইনে অবশ্যই পর্যাপ্ত খেলোয়াড় আছে।’

সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে উন্নতির বিকল্প দেখছেন না হৃদয়। তিনি বলেন, ‘আমরা দিনের পর দিন একই ভুল করছি। ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আবারও ভুল করছি। শুরুতেই কয়েকটা উইকেট হারিয়েছি। ওইটাই আসল কারণ। টপঅর্ডারে রান করতে হবে। নাহলে আপনি টিকতে পারবেন না। আমরা এটা নিয়ে কাজ করব।’

সামনে ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ। সেটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ মনে করছেন হৃদয়, ‘ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ আমাদের জন্য বড় সুযোগ। আমাদের অবশ্যই ভালোভাবে বসে বা যেকোনোভাবে দলটাকে ভালো একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে; কারণ, এশিয়া কাপ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ। আশা করি, ইনশা আল্লাহ আমরা ভালো কিছু করব।’

কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতিতে পরিস্থিতি বদলাবে না। প্রয়োজন ব্যাটিং অর্ডারে ভারসাম্য, কার্যকর মিডল অর্ডার এবং চাপের মধ্যে জুটি গড়ার সক্ষমতা। পরবর্তী ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে হাতে সময়ও খুব বেশি নেই। জিম্বাবুয়ে-আফগানিস্তানের বিপক্ষেই যদি এমন ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটে, তাহলে বড় দলগুলোর সামনে কী অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা!