রফিকুল ইসলাম
বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস এখন আর কোনো নতুন খবর নয়। মাছের বাজার, সবজির দোকান কিংবা চালের আড়ত- সবখানেই ক্রেতার চোখে এক ধরণের অসহায় আত্মসমর্পণ। কিন্তু এই দৃশ্য কেবলই এক টুকরো বাজারের চিত্র নয়, এটি আসলে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারই এখন কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত। মুদ্রাস্ফীতির পারদ যখন প্রতিনিয়ত ওপরে উঠছে, তখন তার পিছু পিছু তাড়া করছে ঋণের এক অক্টোপাস। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক বিপন্ন জনগোষ্ঠী।
স্বাভাবিক আয়ে যখন আর সংসার চলছে না, তখন তারা বাধ্য হচ্ছে সঞ্চয় ভাঙতে, ক্রেডিট কার্ডের সীমা পার করতে কিংবা চড়া সুদে এনজিও ও মহাজনের দ্বারে হাত পাততে। প্রশ্ন হলো, এই যে ঋণের ফাঁদে আমজনতা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে, এই দায়ের উৎস কোথায়? কেন নীতিনির্ধারকদের ভুলের মাশুল সাধারণ মানুষকে তাদের পকেট উজাড় করে দিতে হচ্ছে?
অর্থনীতির সাধারণ সূত্র বলে, মুদ্রাস্ফীতি কিংবা ঋণ সংকট কখনোই কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি মূলত মানবসৃষ্ট এবং ভুল পরিকল্পনার ফসল।
দেশের মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনুৎপাদনশীল বা কম গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্টের পেছনে নেওয়া বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝা।
দেশের মোট পাবলিক ঋণ বা সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা গত এক দশকে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এই ঋণের কিস্তি এবং সুদ পরিশোধের চাপ যখন সরকারের ওপর এসে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে রাজস্ব বাড়াতে হয়। আর সেই রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হয় পরোক্ষ কর, ভ্যাট এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রত্যাহার। ফলে এক ধাক্কায় উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ঘাড়ে।
এর বাইরেও রয়েছে ব্যাংকিং খাতের চরম সুশাসনের অভাব এবং বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ।
এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮,৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম, নামে-বেনামে বেনামী ঋণ জালিয়াতি এবং পুঁজি পাচারের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে গভীর 'পদ্ধতিগত ঝুঁকি' তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর 'মূলধন পর্যাপ্ততা' এবং 'তারল্য ব্যবস্থাপনার' ওপর।
এই তারল্য সংকোচন কাটিয়ে উঠতে এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যাংকগুলো যখন তাদের ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন তার পুরো দায়ভার গিয়ে পড়ছে সৎ এবং ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের ওপর। আবাসন বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নেওয়া ঋণের কিস্তি এক ধাক্কায় আকাশচুম্বী হওয়ায় এই প্রান্তিক উদ্যোক্তারা খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অন্যদিকে, বাজারের অসাধু একচেটিয়াকরণ এবং কৃত্রিম যোগান সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে বড় সিন্ডিকেটগুলো অর্থনীতি থেকে বিশাল অঙ্কের উদ্বৃত্ত তারল্য তুলে নিচ্ছে। এর ফলে যে যোগানজনিত মূল্যস্ফীতি তৈরি হচ্ছে, সাধারণ মানুষ তার নিষ্পাপ ভুক্তভোগী।
সামষ্টিক অর্থনীতির এই কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো - আর্থিক অপরাধী ও শীর্ষ খেলাপিরা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এড়িয়ে বহাল তবিয়তে থাকছে, অথচ রাষ্ট্রকে নিয়মিত কর দেওয়া ও সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষকেই এই নীতিগত ব্যর্থতার চরম মূল্য চুকাতে হচ্ছে।
একটি রাষ্ট্র কতটা কল্যাণকামী, তা পরিমাপ করা যায় সংকটের সময়ে তার সাধারণ নাগরিকেরা কতটা সুরক্ষিত আছেন তা দেখে। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সম্পদের যে চরম অসম বণ্টন ঘটছে, তা সামাজিক বৈষম্যকে এক বিপজ্জনক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে।
এতে ধনীরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ দিয়ে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলে নিতে পারলেও, নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত সমাজ আজ নীরবে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। লোকলজ্জার ভয়ে তারা না পারছেন ওএমএসের লাইনে দাঁড়িয়ে কম মূল্যের পণ্য কিনতে, না পারছেন আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে। ফলে বাধ্য হয়েই ঋণের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে দেশের সিংহভাগ আমজনতা।
ব্যক্তিগত ঋণ যেভাবে একটি পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, ঠিক একইভাবে অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় ঋণ পুরো দেশের অর্থনীতিকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সরকারের নেওয়া ঋণের দায় কেবল নীতিনির্ধারকদের, কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির অমোঘ নিয়মে এই বিশাল ঋণের চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ঘাড়েই এসে পড়ে।
যখন একটি দেশ অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন সরকারের রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ চলে যায় ঋণের কিস্তি এবং সুদ পরিশোধে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার দুটি আত্মঘাতী পথ বেছে নেয়:
প্রথমত, উচ্চ হারে পরোক্ষ কর ও ভ্যাট আরোপ করা হয়, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ বাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত টাকা ছেপে বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নিয়ে সরকার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে। বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লেও উৎপাদন না বাড়ায় জ্যামিতিক হারে বাড়ে মূল্যস্ফীতি। এতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হু হু করে কমতে থাকে।
এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে - একদিকে আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত করের চাপ - সাধারণ মানুষের আয়ের সাথে ব্যয়ের ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। নিজেদের মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সঞ্চয় হারিয়ে চরম সংকটে পড়ে।
ফলশ্রুতিতে, বেঁচে থাকার তাগিদে তারা পুনরায় উচ্চ সুদে ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের দায় অথবা অনানুষ্ঠানিক ঋণের ফাঁদে পড়তে বাধ্য হয়। এভাবে সরকারের নেওয়া সামষ্টিক ঋণের দায় চক্রবৃদ্ধি হারে আমজনতার ব্যক্তিগত ঋণের বোঝায় রূপান্তরিত হয়ে পুরো সমাজকে এক অবিচ্ছেদ্য অর্থনৈতিক চক্রের দিকে ঠেলে দেয়।
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম নির্দেশক হলো তার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্য। তবে ঋণের পরিমাণ যখন জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায়, তখন তা অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মাথাপিছু ঋণের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় (আগস্ট ২০২৪) যেখানে মাথাপিছু মোট সরকারি ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৪ হাজার টাকার কাছাকাছি, তা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা, ডলারের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত রাজস্ব ঘাটতির কারণে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকায়।
সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে এই দায় আরও বেড়ে দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
জনগণের ওপর ক্রমান্বয়ে চেপে বসা এই ঋণের বোঝা এবং সমসাময়িক উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বহুমুখী অভিঘাত বুঝতে একটি গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
১. মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোগত ঋণের লিগ্যাসি
গত দেড় দশকে (২০০৯-২০২৪) দেশের বড় বড় মেগা প্রকল্প যেমন: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেগা রেল লিংক প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, দোহাজারী-কক্সবাজার রেল লিংক প্রকল্প, রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদি বাস্তবায়নের জন্য দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উৎস থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ক্ষমতাচ্যুতির সময় পূর্ববর্তী সরকার প্রায় ১৮.৩৫ লাখ কোটি টাকার বিশাল সরকারি ঋণ রেখে যায়, যার একটি বড় অংশই ছিল বিদেশি ঋণ।
বর্তমান সময়ে এই প্রকল্পগুলোর সিংহভাগের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা ঋণ রেয়াতকাল শেষ হয়ে আসায় এখন মূলধনের পাশাপাশি মোটা অঙ্কের সুদ আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধ করতে হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার আগেই এই ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে চলেছে।
২. টাকায় অবমূল্যায়ন ও বিনিময় হারের প্রভাব
বিগত দুই বছরে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের দায় টাকার অঙ্কে এতটা লাফিয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন। ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া ডলার সংকটের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার মান ডলার প্রতি ৮৫-৯০ টাকা থেকে এক ধাক্কায় ১২০ টাকার ওপরে নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়।
যেহেতু বৈদেশিক ঋণ মূলত ডলারে পরিশোধ করতে হয়, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের পরিমাণে নতুন ঋণ না বাড়লেও, কেবল স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরের কারণে ঋণের মোট দায় এবং মাথাপিছু ঋণের অনুপাত জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বহুমুখী প্রভাব
ঋণ বৃদ্ধির এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে দেশের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, যা বর্তমানে প্রায় ৯.২ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের এই যুগলবন্দী প্রভাব অত্যন্ত জটিল।
তাত্ত্বিকভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে সরকারের পুরনো ঋণের ‘প্রকৃত মূল্য’ কিছুটা কমে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় আশঙ্কাজনকভাবে কম হওয়ায় সরকার মুদ্রাস্ফীতির সুফল নিতে পারছে না। উল্টো, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় জনগণের প্রকৃত আয় ও সঞ্চয় কমে গেছে, যা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের কর আদায়ের সক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতির কারণে যখন চাল, ডাল, জ্বালানি ও যাতায়াত খরচ আকাশচুম্বী হয়, তখন সরকারের পরিচালনা ব্যয়ও বহুলাংশে বেড়ে যায়। এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে এবং ঘাটতি বাজেট পূরণে সরকারকে পুনরায় দেশি-বিদেশি উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে সুদের হার বাড়ায়, তখন সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস (যেমন: ট্রেজারি বিল ও বন্ড) থেকে ঋণ নেওয়ার খরচও অনেক বেড়ে যায়। ফলে ডমেস্টিক ডেট বা অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের কিস্তি মেটাতেই সরকারের রাজস্বের একটি বিশাল অংশ অপচয় হচ্ছে।
৪. রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেট সহায়তা নির্ভরতা
অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে শ্লথগতির কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার আজ তলানিতে। এর ওপর পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে বর্তমান সরকারকে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বড় অঙ্কের 'বাজেট সহায়তা ঋণ' নিতে হচ্ছে।
এই ঋণের একটি বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে আগের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। ফলে দেশ আজ এক ভয়াবহ 'ঋণের ফাঁদে' আটকা পড়েছে, যা সরাসরি জনগণের মাথাপিছু দায় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভুল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, আর্থিক খাতে সুশাসনের চরম অভাব এবং বাজারের অসাধু সিন্ডিকেটের তৈরি করা এই কৃত্রিম সংকটের দায় শেষ পর্যন্ত আমজনতার ওপরেই বর্তাচ্ছে। করের বোঝা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং বর্ধিত ঋণের কিস্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষই আজ অনিচ্ছাকৃতভাবে এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে।
সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সামগ্রিক প্রভাব ও উত্তরণের পথ
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৪০.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যদিও তা আন্তর্জাতিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ সীমার নিচে রয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ডেট সাসটেইনেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক (ডিএসএফ) অনুযায়ী দেশের ঋণঝুঁকি 'নিম্ন' থেকে 'মাঝারি' ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সংকটটি তৈরি হয়েছে রাজস্ব আদায় ও ঋণ পরিষেবার ভারসাম্যহীনতায়। মোট অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের একটি সিংহভাগ অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলস্বরূপ, মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো উচ্চ-গুণক প্রভাবসম্পন্ন সামাজিক খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ সংকুচিত হচ্ছে।
একদিকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করছে, অন্যদিকে মাথাপিছু ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আর্থিক দায় চাপিয়ে দিচ্ছে। এই দ্বিমুখী ধাক্কা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে তুলেছে।
এই কাঠামোগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে অবিলম্বে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণীত এবং অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্পের মোহ ত্যাগ করে প্রকল্প মূল্যায়ন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে কঠোর হতে হবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে রাজস্ব-সংকোচন নীতি বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।
একই সাথে, আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ব্যাংকিং খাতের পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ (এনপিএল) আদায়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ করের আওতা সম্প্রসারণ এবং অর্থ পাচার রোধে আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বহিরাগত ঋণের ফাঁদ এড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নড়বড়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আমূল সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠন করার এখনই উপযুক্ত সময়। এই মুহূর্তে যদি সাহসী এবং সুদূরপ্রসারী আর্থিক ও মুদ্রানীতিগত সংস্কার সাধন করা না যায়, তবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে এবং দেশ এক গভীর মধ্যম আয়ের ফাঁদে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা