বিশ্বের গড় আয়ু ৭৩.৩ বছর, এগিয়ে বাংলাদেশ (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: উত্তর, ৭২ দশমিক ৭ বছর। তবে, ভারতে ৭১ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৮ দশমিক ২ বছর।

অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু বেশি। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়।

একই সময়ে বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৩ বছর। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মানুষ বৈশ্বিক গড়ের খুব কাছাকাছি থাকলেও এখনো প্রায় সাত মাস পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO-এর চলতি বছরের ২ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ Global Health Estimates-এ ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির এই চিত্র উঠে এসেছে।

 

নারী-পুরুষের ব্যবধান

বাংলাদেশের হিসাবটা আরও একটু ভাঙলে দেখা যায়, পুরুষের গড় আয়ু ৭১ দশমিক ১ বছর। আর নারীদের ৭৪ দশমিক ৪ বছর। অর্থাৎ, পুরুষের চেয়ে নারীরা গড়ে প্রায় ৩ বছর ৩ মাস বেশি বেঁচে থাকছেন। কিন্তু কেন?

জন্মের পর মৃত্যুঝুঁকি, জীবনযাপন, পেশাগত ঝুঁকি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রবণতা, এমন নানা বিষয় নারী-পুরুষের আয়ুর ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তাই শুধু গড় আয়ু বাড়লেই প্রশ্ন শেষ নয়। এই বাড়তি বছরগুলো মানুষ কেমন স্বাস্থ্য নিয়ে কাটাচ্ছেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

করোনা কতটা পিছিয়ে দিয়েছিল?

কারণ, আয়ুর এই গল্পের মাঝখানে আছে একটি বড় ধাক্কা—করোনা মহামারি।

মহামারির আগে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৭৩ দশমিক ৪ বছর। তবে, মহামারির সময় বিশ্বজুড়েই আয়ু কমে যায়। ২০২১ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু নেমে আসে ৭১ দশমিক ৫ বছরে।

তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু আবার উঠে আসে ৭৩ দশমিক ৩ বছরে, যা ২০১৯ সালের ৭৩ দশমিক ৪ বছরের প্রায় কাছাকাছি। অর্থাৎ, করোনার ধাক্কা সামলে আয়ু ফিরেছে, কিন্তু পুরো স্বাস্থ্যচিত্র এখনো আগের জায়গায় ফেরেনি।

দীর্ঘ জীবন মানেই সুস্থ জীবন?

এখানেই WHO-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। গড়ে একজন মানুষ ৭৩ দশমিক ৩ বছর বাঁচতে পারেন। কিন্তু, পুরো সময়টা সুস্থভাবে কাটান না।

২০২৩ সালে বিশ্বের Healthy Life Expectancy, অর্থাৎ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত সময় ছিল ৬২ দশমিক ৮ বছর। এই দুই সংখ্যার ব্যবধানটি প্রায় সাড়ে ১০ বছর। তবে এর মানে এই নয় যে, জীবনের শেষ সাড়ে ১০ বছর সবাই অসুস্থ থাকবেন।

বরং রোগ, অক্ষমতা বা স্বাস্থ্যহানির কারণে পুরোপুরি সুস্থ না থাকা সময়কে হিসাব করেই এই সূচক তৈরি হয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ২০১৯ সালে যেখানে এই সুস্থ জীবনযাপনের প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি, ২০২৩ সালেও সেটি শূন্য দশমিক ৪ বছর পিছিয়ে। অর্থাৎ, বাঁচার বছর ফিরেছে দ্রুত, কিন্তু সুস্থ থাকার বছর ফিরছে ধীরে।

মানুষের মৃত্যুর হার বেড়েছে কেন?

আর এখানেই বদলে গেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একসময় সংক্রামক রোগ ছিল মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি। কিন্তু, এখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর বড় অংশের পেছনে রয়েছে অসংক্রামক রোগ।

WHO বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশই ছিল অসংক্রামক রোগের কারণে। ২০০০ সালে এই হার ছিল ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে অসংক্রামক রোগের অংশ বেড়েছে ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। আর ২০২৩ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ মৃত্যুর কারণের ৮টিই ছিল অসংক্রামক রোগ।

সবচেয়ে বড় ঘাতক—হৃদ্‌রোগ

এই তালিকার সবচেয়ে ভয়ংকর নাম—হৃদ্‌রোগ। WHO-এর হিসাবে ২০২৩ সালে শুধু ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে বিশ্বে মারা গেছেন প্রায় ৯৫ লাখ মানুষ। শুধু মৃত্যুই নয়, এই একটি রোগের কারণে বিশ্বে হারিয়েছে প্রায় ২১ কোটি বছর সমপরিমাণ সুস্থ জীবন।

এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদ্‌রোগ এবং কিডনি রোগ। অর্থাৎ, মানুষ এখন শুধু সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ছে না। লড়াইটা ক্রমেই চলে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার দিকে।

ডায়াবেটিস ও ডিমেনশিয়ার চাপ

WHO-এর নতুন বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে দুটি বড় উদ্বেগ—ডায়াবেটিস ও ডিমেনশিয়া।

বিশেষ করে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডায়াবেটিসে মৃত্যুর ঝুঁকি ২০০০ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আর ডিমেনশিয়ার অবস্থানও বদলে গেছে। ২০০০ সালে বিশ্বে মৃত্যুর কারণের তালিকায় ডিমেনশিয়া ছিল ১৯তম। ২০২৩ সালে উঠে এসেছে পঞ্চম স্থানে। এই সময়ে ডিমেনশিয়ায় বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে।

নীরব সংকট-মানসিক স্বাস্থ্য

আরেকটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে এমন এক জায়গায়, যেটি অনেক সময় চোখেই দেখা যায় না—মানসিক স্বাস্থ্য।

২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বে বিষণ্নতাজনিত রোগে স্বাস্থ্যহানি বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। উদ্বেগজনিত সমস্যা বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। শুধু এই দুই ধরনের সমস্যার কারণেই ২০২৩ সালে অকালমৃত্যু ও অক্ষমতার মাধ্যমে বিশ্ব হারিয়েছে আনুমানিক ১১ কোটি বছর সমপরিমাণ সুস্থ জীবন। অর্থাৎ দীর্ঘ জীবন পেলেই জীবন ভালো—এমন সমীকরণ আর খাটছে না।

বাংলাদেশের জন্য বার্তা কী?

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় বার্তা। গড় আয়ু বাড়ানো নিঃসন্দেহে সাফল্য। ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সামনে চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন।

বয়স বাড়বে, প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে, ডায়াবেটিস-হৃদ্‌রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার চাপ বাড়বে। তাই শুধু মানুষকে আরও বেশি বছর বাঁচানো নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত করতে হবে মানুষকে আরও বেশি বছর সুস্থ রাখার জন্য।

দীর্ঘায়ু নয়, সুস্থতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

শেষ পর্যন্ত আমরা কত বছর বাঁচব, সেটি শুধু ভাববার বিষয় নয়। ভেবে দেখুন, সেই বছরগুলোর কতটা আমরা সুস্থভাবে বাঁচব? কারণ WHO-এর নতুন হিসাব বলছে, দীর্ঘ জীবন এখন আর একমাত্র লক্ষ্য নয়; সুস্থ জীবনই পরবর্তী বড় লড়াই।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি