জাতীয় অর্থনীতি: মার্কেন্টাইল ব্যাংক ২০২৪ সালে এমবিএল রেইনবো অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআর সেবা চালু করে। দুই বছর পর এসে এই সেবার বর্তমান অবস্থা কেমন? কতজন গ্রাহক ও মার্চেন্ট এটি ব্যবহার করছেন?
মতিউল হাসান: মার্কেন্টাইল ব্যাংক শুরু থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর, সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংসেবা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে এমবিএল রেইনবো অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআর সেবা চালু করা হয়। বর্তমানে এটি আমাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বর্তমানে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪০ জন এমবিএল রেইনবো ব্যবহারকারী বাংলা কিউআর সেবা ব্যবহার করছেন।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং বাংলা কিউআরকে দৈনন্দিন লেনদেনের সহজ, স্বাভাবিক ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে আমাদের বিদ্যমান কারেন্ট অ্যাকাউন্ট গ্রাহকদেরও বাংলা কিউআরের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ বাড়বে এবং নগদনির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলা কিউআর নিয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আগামী দিনে এটিকে কতটা বড় করতে চান?
মতিউল হাসান: আমরা বাংলা কিউআরকে শুধু একটি কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট সেবা হিসেবে দেখছি না। এটি দেশের বৃহত্তর ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বিদ্যমান কারেন্ট অ্যাকাউন্ট গ্রাহকদের পর্যায়ক্রমে বাংলা কিউআরের আওতায় আনা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ আরও সহজ করা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে এ সেবা পৌঁছে দিতে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা চাই, একজন ব্যবসায়ী যেন সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন এবং একজন গ্রাহক যেন নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে দৈনন্দিন লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলা কিউআর ব্যবহারে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন? ব্যাংকের জন্য এর ব্যবসায়িক গুরুত্ব কতটা?
মতিউল হাসান: বাংলা কিউআরের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর সহজতা ও ব্যবহারিকতা। একজন গ্রাহক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সহজেই পেমেন্ট করতে পারেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীর জন্য এটি লেনদেন গ্রহণের একটি সহজ ও ডিজিটাল মাধ্যম। ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকেও এর গুরুত্ব অনেক। ডিজিটাল লেনদেনের ফলে ব্যবসায়ীদের আর্থিক কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ হয়। একইসঙ্গে ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা বাড়ে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হয়। ভবিষ্যতে এসব ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উপযোগী ব্যাংকিংসেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে মার্কেন্টাইল ব্যাংক কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?
মতিউল হাসান: ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর সম্পর্কে সচেতন করা এবং ডিজিটাল লেনদেন গ্রহণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের বিদ্যমান কারেন্ট অ্যাকাউন্ট গ্রাহকদের বাংলা কিউআরের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ভাসমান ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ব্যবসার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে কাজ করছি। আমাদের বিশ্বাস, ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা শুধু বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি পর্যায়ের উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলা কিউআরের আন্তঃব্যবহার যোগ্যতা বা ইন্টার অপারেবিলিটি কতটা কার্যকর হয়েছে বলে মনে করেন? এখনও কী ধরনের সমস্যা রয়েছে?
মতিউল হাসান: বাংলা কিউআরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ইন্টার অপারেবিলিটি। ফলে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা একটি অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবেন। বাংলাদেশের একটি কার্যকর ও সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ধরনের বৃহৎ পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত ইন্টিগ্রেশন, এপিআই কানেক্টিভিটি, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পর্যায়ক্রমে এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য গ্রাহকের জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন ও সহজ পেমেন্ট অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলা কিউআর লেনদেনের নিরাপত্তা ও প্রতারণা ঠেকাতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রস্তুতি কেমন?
মতিউল হাসান: ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে আস্থা ও নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্রাহকের আস্থা ছাড়া কোনো ডিজিটাল সেবা দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। তাই বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে লেনদেনের নিরাপত্তা, গ্রাহক সচেতনতা ও প্রতারণা প্রতিরোধকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহক সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গ্রাহকদের পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য গোপন তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করার বিষয়ে সচেতন করছি। একইসঙ্গে সন্দেহজনক কোনো লেনদেন বা কার্যক্রম দেখা গেলে দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিচ্ছি। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও গ্রাহক সচেতনতার সমন্বয়ে একটি নিরাপদ ও আস্থাশীল ডিজিটাল পেমেন্ট পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ কতটা রয়েছে?
মতিউল হাসান: ডিজিটাল লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি নিয়মতান্ত্রিক লেনদেনের ইতিহাস তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য তাদের আর্থিক কার্যক্রম ও লেনদেনের ধরন বুঝতে সহায়ক হতে পারে। তবে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু লেনদেনের তথ্যের ওপর নির্ভর করা হবে না। গ্রাহকের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি, পরিশোধ সক্ষমতা, কেওয়াইসি এবং ব্যাংকের বিদ্যমান ঋণনীতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হবে। ভবিষ্যতে যথাযথ নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার আলোকে ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ঋণসেবা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতি: এমবিএল রেইনবো অ্যাপকে আরও জনপ্রিয় করতে ব্যাংকের পরিকল্পনা কী? ভবিষ্যতে এতে নতুন কী ধরনের ডিজিটাল সেবা যুক্ত হতে পারে?
মতিউল হাসান: এমবিএল রেইনবো আমাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। আমরা চাই, গ্রাহকের দৈনন্দিন ব্যাংকিং প্রয়োজনের একটি বড় অংশ যেন সহজ, নিরাপদ ও ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। বর্তমানে রেইনবো অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে গ্রাহকের প্রয়োজন, প্রযুক্তির বিকাশ ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিবেচনায় আরও পেমেন্ট, লেনদেন এবং মূল্য সংযোজিত ডিজিটাল সেবা যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য রেইনবো অ্যাপকে শুধু একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে নয়, বরং গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা।
জাতীয় অর্থনীতি: আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থায় বাংলা কিউআরকে কোথায় দেখতে চান? ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়তে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভূমিকা কী হবে?
মতিউল হাসান: আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে আমি বাংলা কিউআরকে বাংলাদেশের ক্যাশলেস ও ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাই। শুধু শহরাঞ্চল নয়, দেশের ছোট শহর, উপজেলা ও প্রত্যন্ত এলাকার ব্যবসায়ীরাও যেন সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন— এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য। মার্কেন্টাইল ব্যাংক এ পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়। আমাদের বর্তমান ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪০ জন রেইনবো ব্যবহারকারী একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন আমরা বিদ্যমান কারেন্ট অ্যাকাউন্ট গ্রাহকদের বাংলা কিউআরের আওতায় নিয়ে আসার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করবেন এবং একজন সাধারণ গ্রাহকও দৈনন্দিন কেনাকাটায় নগদের পরিবর্তে নিরাপদ ও সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।
জাতীয় অর্থনীতি: সব মিলিয়ে বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? মার্কেন্টাইল ব্যাংক কীভাবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে?
মতিউল হাসান: বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকের আস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল গ্রাহক প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, গ্রাহকরাও তত বেশি দ্রুত, সহজ ও নিরাপদ সেবা প্রত্যাশা করছেন।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রাহক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা বাংলা কিউআর, এমবিএল রেইনবো এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের আরও সহজ ও আধুনিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
আমাদের বিশ্বাস, ডিজিটাল রূপান্তর শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি গ্রাহকের আস্থা, সেবার মান এবং ব্যাংকিং সংস্কৃতির পরিবর্তনের বিষয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই মার্কেন্টাইল ব্যাংক একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।