সামুদ্রিক মাছ রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে

বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাছ শুধু খাদ্যের উৎস নয়, দেশের কোটি মানুষের জীবিকা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদা, নির্বিচার আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু দেশের মাছের উৎপাদন বাড়লেও সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া বিশেষ জরুরি।

গতকাল ‘জাতীয় অর্থনীতি’র এক প্রতিবেদনে ‘সামুদ্রিক মাছ অতি আহরণে দেশে বাড়ছে ক্ষতির শঙ্কা’ সামুদ্রিক মাছের প্রয়োজনীয়তার স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ-অ্যাকশনস ফর এ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ প্রতিবেদনে সামুদ্রিক খাদ্যনির্ভর পুষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অণুপুষ্টির চাহিদা পূরণে সামুদ্রিক খাবারের ওপর নির্ভরতা প্রায় ৯ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনে সামুদ্রিক খাবারনির্ভর পুষ্টির ক্ষতির কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সংকট কেবল জেলেদের আয় বা মাছের বাজারদরের বিষয় নয়, এর সঙ্গে মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতিরও সম্পর্ক রয়েছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীবের বক্তব্যেও গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিনচালিত ও ছোট আকারের নৌযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হলেও এসব নৌযানের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সমুদ্রের মাছের মজুদ কত, প্রতিবছর প্রাকৃতিকভাবে কত মাছ উৎপাদিত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে কতটা আহরণ করা সম্ভব— এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া কঠিন। সমুদ্রের সম্পদকে অসীম ধরে নেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এজন্য প্রয়োজন বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জরিপ। কোন এলাকায় কী প্রজাতির মাছ কত পরিমাণে রয়েছে, কোন প্রজাতির প্রজনন মৌসুম কখন এবং মাছের মজুদ কী হারে পরিবর্তিত হচ্ছে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রজাতি ও অঞ্চলভেদে আহরণের সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের বিকল্প আয় ও খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত না করলে তাদের পক্ষে নিয়ম মানা কঠিন হবে। তাই সংরক্ষণনীতির সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষারও সমন্বয় জরুরি।

এছাড়া অবৈধ ও অতিরিক্ত মাছ আহরণ বন্ধে নজরদারি জোরদার করতে হবে। নিবন্ধিত নৌযানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, নৌযানের চলাচল ও আহরণ পর্যবেক্ষণ এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে মাছ ধরার জাল ও সরঞ্জামের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে ছোট মাছ ও প্রজননক্ষম মাছ নির্বিচারে ধরা না পড়ে। উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জেলে, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। সামুদ্রিক মাছের আবাসস্থল, প্রবাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। দূষণ, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকের কারণে সামুদ্রিক পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা কমানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মৎস্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে গবেষণার ফলাফল বাস্তব ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাতে হবে। 

বঙ্গোপসাগর শুধু বর্তমান প্রজন্মের সম্পদ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও অধিকার রয়েছে এর ওপর। আজ অতিরিক্ত মাছ আহরণ করে সাময়িক লাভ অর্জন করা সম্ভব হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হবে জেলে, ভোক্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে। তাই সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ কেবল মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব নয়, এটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, গবেষক, ব্যবসায়ী, জেলে ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিকল্পিত আহরণ, কঠোর নজরদারি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জনসচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সমুদ্রের মাছ ও সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।