জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটি হলুদ জ্যাকেট! দেখতে সাধারণ, ব্যবহারও খুব সাধারণ কাজে। অথচ, এই জ্যাকেটই একসময় ফ্রান্সের রাজপথে পরিণত হয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীকে।
শুরুটা ছিল জ্বালানির দাম আর করের বোঝা নিয়ে। কিন্তু সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে মজুরি, বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় আর সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে।
আট বছর পর, ২০২৬ সালে আবারও আলোচনায় সেই, ইয়েলো ভেস্ট। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার রাস্তায় নামছেন ফরাসিরা? আর একটি অনলাইন আবেদন কীভাবে বদলে দিয়েছিল ফ্রান্সের রাজনীতির সমীকরণ?
ইয়েলো ভেস্ট কারা?
ইয়েলো ভেস্ট কোনো একক রাজনৈতিক দল নয়, নয় কোনো নির্দিষ্ট শ্রমিক সংগঠনও। এটি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদী আন্দোলন, যার ফরাসি নাম, জাইল জোন।
চালক, দোকানকর্মী, ছোট ব্যবসায়ী, সেবাকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, বিভিন্ন পেশার মানুষ এতে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের অনেকেরই চাকরি ছিল, কিন্তু মাস শেষে আয় দিয়ে সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল।
আর নামের রহস্য? ফ্রান্সে গাড়িতে জরুরি ব্যবহারের জন্য উজ্জ্বল হলুদ নিরাপত্তা জ্যাকেট রাখা বাধ্যতামূলক। প্রতিবাদকারীরা সেই জ্যাকেট পরেই রাস্তায় নামেন। ধীরে ধীরে পোশাকটি হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্যের প্রতীক।
অনলাইন আবেদন থেকে রাজপথে বিস্ফোরণ
গল্পের শুরু ২০১৮ সালের মে মাসে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রিসিলিয়া লুদোস্কি অনলাইনে একটি আবেদন প্রকাশ করেন। দাবি, কমাতে হবে জ্বালানির দাম। প্রথম দিকে তেমন সাড়া মেলেনি। কিন্তু জ্বালানির খরচ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ বাড়তে থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই আবেদন। ট্রাকচালক এরিক দ্রুয়েসহ অন্যরাও বিক্ষোভের ডাক দিতে এগিয়ে যান।
এরপর আসে ১৭ নভেম্বর, ২০১৮। ফ্রান্সজুড়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। কেউ মহাসড়কে, কেউ শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে, কেউ আবার গোলচত্বরে। কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেই, নেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এক নেতা। ফেসবুকের গ্রুপ, ভিডিও আর স্থানীয় উদ্যোগেই ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। অর্থাৎ, অনলাইনে শুরু হওয়া ক্ষোভ এবার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় সরকারের সামনে।
জ্বালানির দাম কেন হয়ে উঠল জাতীয় ক্ষোভ?
প্রশ্ন হলো, জ্বালানির দাম বাড়লেই কি একটি দেশে এমন আন্দোলন হয়? ফ্রান্সের ক্ষেত্রে জ্বালানির কর বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা ছিল ক্ষোভের বড় কারণ। সরকারের যুক্তি ছিল, দূষণ কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াতকে উৎসাহিত করতে এই উদ্যোগ প্রয়োজন।
কিন্তু গ্রাম ও শহরতলির অনেক মানুষের কাছে গাড়ি বিলাসিতা নয়, কাজের জায়গায় পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় মাধ্যম। গণপরিবহনের বিকল্প সীমিত হলে জ্বালানির খরচ বাড়ার অর্থ হলো, সংসারের বাজেটে নতুন চাপ।
এখানেই আন্দোলনের মূল প্রশ্নটি বদলে যায়। পরিবেশ রক্ষার খরচ কে বহন করবে? সাধারণ মানুষ, নাকি বেশি সামর্থ্যবানরাও নেবেন সমান দায়িত্ব? তাই এই আন্দোলন শুধু পেট্রলের দাম কমানোর দাবি ছিল না। এর ভেতরে জমেছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের কথা না শোনার ক্ষোভ।
কী অর্জন করেছিল ইয়েলো ভেস্ট?
আন্দোলনের চাপে সরকারকে পিছু হটতে হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপ ঘোষণা দেন, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা জ্বালানি কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা স্থগিত করা হচ্ছে। পরে সেই প্রস্তাব বাতিল করা হয়।
কিন্তু আন্দোলনকারীদের দাবি তখন আর শুধু জ্বালানিতেই আটকে নেই। তাদের দাবি, ন্যায্য করব্যবস্থা, উন্নত জনসেবা, ভালো মজুরি এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নাগরিকদের সরাসরি মত দেওয়ার সুযোগ। নাগরিকের উদ্যোগে গণভোটের দাবিও সামনে আসে।
তবে আন্দোলনের ভেতরে মতপার্থক্য ছিল। কেউ বামপন্থী, কেউ ডানপন্থী, কেউ আবার কোনো দলের সঙ্গেই যুক্ত হতে চাননি। এক পোশাক তাদের এক করলেও, সব বিষয়ে একমত করতে পারেনি।
২০২৬ সালে আবার কেন ফিরছে হলুদ জ্যাকেট?
এবারকার প্রেক্ষাপট কিছুটা আলাদা, কিন্তু ক্ষোভের জায়গায় রয়েছে মিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিসের কয়েকটি স্কুলে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও দুর্বল অবকাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুরু হয়। পরে সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে।
গত ১৭ অক্টোবর শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন এবং ইয়েলো ভেস্টের আন্দোলনকারীদের একাংশ একসঙ্গে রাজপথে নামেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেদিন দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি ছিল আরও বেশি। অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ হলেও, কিছু জায়গায় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়। এতে বৈধ প্রতিবাদের দাবি এবং সহিংস কর্মকাণ্ড, দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ; জ্যাকেটের চেয়েও বড় প্রশ্ন
২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভেও উত্তেজনার আশঙ্কা ছিল। তবে, রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে আবারও বড় জমায়েত হয় এবং আগের সপ্তাহের তুলনায় ব্যাপক সহিংসতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবু মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা নিয়ে ক্ষোভ কমেনি। নতুন কর্মসূচির ডাকও এসেছে।
ইয়েলো ভেস্টের গল্প তাই শুধু ফ্রান্সের একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়। এটি দেখায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তখন ছোট একটি দাবি থেকেও জন্ম নিতে পারে বড় প্রতিবাদ।
একটি হলুদ জ্যাকেট হয়তো নিজে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু সেই জ্যাকেট পরে যখন হাজারো মানুষ রাস্তায় নামেন, তখন তাদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সহজ থাকে না। ফ্রান্সের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, এই ক্ষোভ কি নীতিগত পরিবর্তন আনবে, নাকি আবারও ফিরে আসবে রাজপথের সংঘাত?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
