এলডিসি উত্তরণ পেছাল, সংস্কারের জন্য তিন বছর পেল বাংলাদেশ (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: এলডিসি থেকে উত্তরণে আর তাড়াহুড়ো নয়! বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ। ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হবে বাংলাদেশ। এতে আপাতত স্বস্তি ফিরেছে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কিন্তু এই তিন বছর কি সত্যিই বদলে দিতে পারবে দেশের অর্থনীতির চিত্র? নাকি ২০২৯ সালে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ?

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা বা এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। তবে অর্থনীতির নানা সংকট ও প্রস্তুতির ঘাটতি বিবেচনায় সময় বাড়ানোর আবেদন করে সরকার। অবশেষে সেই আবেদনে সাড়া দিলো জাতিসংঘ।

 

১৯৭৫ সালে এলডিসিভুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা এবং সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণসহায়তা পেয়ে আসছে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের জাতিসংঘের মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা-তিনটি সূচকেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে দেশটি।

তবে কোভিড-১৯-এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অর্থনীতির প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হয়। এসব বিষয় তুলে ধরে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কাছে তিন বছর সময় চেয়ে আবেদন করে সরকার।

বাড়তি এই তিন বছরকে কাজে লাগাতে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত চার পর্যায়ের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

প্রথম পর্যায়ে ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরবর্তী পর্যায়ে শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন পণ্য ও নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে ২০২৯ সালের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি মূল্যায়ন করে প্রকাশ করা হবে জাতীয় প্রস্তুতি প্রতিবেদন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এরই মধ্যে জাপানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও চুক্তির উদ্যোগ চলছে।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ রপ্তানি খাত নিয়ে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উঠে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বছরে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার কমতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা উঠে গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি কমতে পারে ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ, কানাডায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জাপানে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

এ ছাড়া তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব ও অন্যান্য বিধিনিষেধ এবং রপ্তানি প্রণোদনা সীমিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ২০২৯ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে নতুন করে প্রস্তুতির সুযোগ দিয়েছে। তবে এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করছে আগামী তিন বছরে সংস্কার পরিকল্পনার বাস্তবায়নের ওপর।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি