জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেই কি ঘুষ কমে যাবে? বেতন-ভাতা ভালো হলে কি একজন কর্মকর্তা আর দুর্নীতি করবেন না? নাকি বেতন বাড়ানোর পরও আগের মতোই চলবে ঘুষের লেনদেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে। আর সেই গবেষণাগুলোর ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। কোথাও দেখা গেছে, ভালো বেতন দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। আবার কোথাও সরকারি কর্মীদের বেতন দ্বিগুণ করার পরও ঘুষ কমেনি, বরং বেড়েছে।
অর্থাৎ, পে স্কেল বাড়ানো আর দুর্নীতি কমানো এক বিষয় নয়।
প্রথমে দেখা যাক, অর্থনীতির গবেষণা কী বলছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের গবেষণায় সরকারি কর্মীদের বেতন এবং দুর্নীতির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সাধারণ যুক্তিটি হলো, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ভালো বেতন পান, তাহলে ঘুষ নিতে গিয়ে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তার কাছে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে। নিয়ম ভাঙার শাস্তি কার্যকর হলে ভালো বেতন সৎ থাকার আর্থিক প্রণোদনা তৈরি করতে পারে।
কিন্তু আইএমএফের গবেষণাতেই সতর্ক করা হয়েছে, শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করতে গেলে অবাস্তব রকমের বড় বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নজরদারি এবং শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
এবার আসা যাক এমন একটি গবেষণায়, যেখানে ফলাফল প্রত্যাশার ঠিক উল্টো ছিল।
২০১০ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানায় পুলিশ কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সড়কে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা কমানো। কিন্তু এই বেতন বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, ঘুষ কমার বদলে পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘুষ আদায়ের তৎপরতা বেড়েছিল। ঘুষের পরিমাণ এবং ট্রাকচালকদের মোট ঘুষ দেওয়ার অঙ্কও বেড়ে যায়।
গবেষকেরা সড়কপথে ট্রাক চলাচলের তথ্য ব্যবহার করে বেতন বৃদ্ধির আগের ও পরের পরিস্থিতি তুলনা করেন। ফলাফলটি দেখিয়ে দেয়, শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বেতন বাড়ালে কখনোই দুর্নীতি কমে না।
২০০৩ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস শহরের সরকারি হাসপাতালগুলোর কেনাকাটার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলার সময় হাসপাতালের কিছু সাধারণ পণ্য কেনার দাম প্রথম নয় মাসে ১৫ শতাংশ কমে যায়। পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা বাড়লেও তা অভিযানের আগের তুলনায় ১০ শতাংশ কম ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, কঠোর নজরদারির পর্যায়ে বেতন বৃদ্ধি নিজে দুর্নীতি কমানোর প্রধান কারণ ছিল না। তবে নজরদারি কিছুটা কমে আসার পর্যায়ে ভালো বেতনের সঙ্গে দুর্নীতি কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
এই গবেষণার শিক্ষা হলো, বেতন এবং নজরদারি একসঙ্গে কীভাবে কাজ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এবার আসা যাক আরও সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়
২০২৩ সালে *জার্নাল অব কম্পারেটিভ ইকোনমিকস*-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মীদের বেতন এবং দুর্নীতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি খাতে বেতনের বৈষম্য কম থাকলে বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু একই খাতে বেতনের বৈষম্য বেশি হলে বেতন বাড়ানোর ফল উল্টোও হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু মোট বেতন কত বাড়ল, তা নয়; সরকারি কর্মীদের মধ্যে বেতন কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এখন বাংলাদেশের প্রশ্নে আসা যাক।
এখানে নতুন পে স্কেল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমটি হলো সরকারি কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়টি হলো ঘুষ ও দুর্নীতি কমানো।
ন্যায্য বেতন কর্মীদের আর্থিক চাপ কমাতে পারে। যোগ্য কর্মী নিয়োগ ও ধরে রাখতেও তা সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা পড়বেন কি না, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, কিংবা সরকারি সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন কর্মকর্তা জানেন যে ঘুষ নিলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত হবে না, অবৈধ আয় জব্দ হবে না এবং চাকরির ঝুঁকিও খুব কম। শুধু বেতন বাড়িয়ে তার দুর্নীতির প্রণোদনা দূর করা কঠিন হতে পারে।
আবার কোনো কর্মকর্তা ভালো বেতন পেলেও যদি কাজের প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ থাকে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকে এবং ঘুষের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে দুর্নীতি চলতে পারে।
তাই কার্যকর সমাধানের জন্য বেতন সংস্কারের পাশাপাশি সম্পদের হিসাব যাচাই, সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা, স্বাধীন তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবশেষে মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। পে স্কেল হলে কি ঘুষ ও দুর্নীতি কমে?
আন্তর্জাতিক গবেষণার উত্তর হলো, কমতে পারে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে কমবেই—এমন নয়। বেতন বৃদ্ধি একটি সহায়ক পদক্ষেপ হতে পারে; একা এটি দুর্নীতি নির্মূলের সমাধান নয়।
সরকারি কর্মীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। কারণ, দুর্নীতি কমানোর জন্য শুধু বেতন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি বাড়ানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত পে স্কেলের সাফল্য শুধু বেতন কত বাড়ল, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ল কি না, ঘুষের সুযোগ কমল কি না এবং সাধারণ মানুষ হয়রানি ছাড়া সেবা পেলেন কি না—সেই ফলাফলও দেখতে হবে।
সরকারি কর্মীদের বেতন দ্বিগুণ করলেই কি ঘুষ বন্ধ হয়ে যাবে? পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানার একটি গবেষণা কিন্তু ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। ২০১০ সালে দেশটিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সড়কে ঘুষের প্রবণতা কমানো। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, বেতন বাড়ানোর পর ঘুষ আদায়ের তৎপরতা এবং ঘুষের পরিমাণ বেড়েছিল। অর্থাৎ, ভালো বেতন গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যায় না। ঘুষের সুযোগ বন্ধ করা, কার্যকর নজরদারি এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রশ্ন হলো, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতি ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি