তাসলিমা আখতার বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি ও শ্রম সংস্কার কমিশনের-২০২৪ সদস্য। এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসন বিষয়ে মাস্টার্স ও এমফিল সম্পন্ন করেছেন। তৈরি পোশাক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় অর্থনীতি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, দাবি ও দুর্দশার বিষয়ে কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
জাতীয় অর্থনীতি: তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। অথচ পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এত বড় অবদান রাখা একটি শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি এত কম থাকার কারণ কী?
তাসলিমা আখতার: আমাদের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এ শিল্পের বিকাশে শ্রমিকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, শ্রমিকরা এখনও কাঙ্ক্ষিত মজুরি পাচ্ছেন না। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকের জীবনধারণের ব্যয়, খাদ্য, বাসস্থান, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতাসহ প্রায় ১২টি মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণের কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিকপক্ষের সক্ষমতা ও বাস্তবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও তাদের ন্যায্য দাবিগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
গত ১৫ বছরে দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কিন্তু মজুরি বোর্ডগুলোয় শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার যথাযথ প্রতিফলন আমরা দেখিনি। আমরা আশা করি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় এবার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মজুরি নির্ধারণ হবে। এ গণ-অভ্যুত্থানেও শ্রমিকরা প্রাণ দিয়েছেন। নতুন শ্রম আইনে পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর মজুরি নির্ধারণের বিধান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। আমরা চাই, শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের দাবি ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এমন মজুরি নির্ধারণ করা হোক, যাতে শ্রমিকরা ভালো থাকেন। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হলে উৎপাদনশীলতাও বাড়বে এবং এ শিল্প আরও বিকশিত হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় বেশি মজুরি দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। তাহলে বাংলাদেশে কম মজুরির ওপর নির্ভরশীলতার কারণ কী?
তাসলিমা আখতার: আমরা শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে সবসময়ই শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ মজুরির দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু বারবারই দেখছি, শ্রমিকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সমাজ, মালিকপক্ষ কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়— সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।
আমাদের অর্থনীতির বিকাশ হচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকদের এখনও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মালিকপক্ষকে বুঝতে হবে, শ্রমিকরা এ শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ছাড়া এ শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়। শ্রমিকদের শুধু উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, মানুষ ও নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে কম মজুরির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে আরও সময় লাগবে। আমরা চাই, দেশের পোশাক শ্রমিকরা একটি মর্যাদাপূর্ণ মজুরি পান।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় ৩০ হাজার টাকা কি যথেষ্ট, নাকি আরও বেশি মজুরি প্রয়োজন?
তাসলিমা আখতার: তিন বছর আগে আমরা ২৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল সাড়ে ১২ হাজার টাকা। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এ মজুরিতে শ্রমিকদের জীবনধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। গ্যাস সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে শ্রমিকদের পক্ষে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরির বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। মজুরি বোর্ডকে এসব প্রস্তাব ও জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যদিকে পোশাক খাতের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। করোনা মহামারির পর এ খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও পোশাক খাত তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। উদ্যোক্তারা এ খাত থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের স্বপ্ন দেখছেন।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় আমরা মনে করি, পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ মজুরি দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের দাবি তুলে ধরবে, মালিকপক্ষও তাদের প্রস্তাব দেবে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মজুরি বোর্ডকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে শ্রমিকরা সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।
জাতীয় অর্থনীতি: প্রতিযোগী অনেক দেশ প্রতিবছর মজুরি পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করে। বাংলাদেশে সাধারণত তিন বছর পরপর মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। ঘন ঘন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় বাংলাদেশের মজুরি নির্ধারণ পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?
তাসলিমা আখতার: আমাদের দেশে প্রতিবছর শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি আগে পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান ছিল। এখন তা কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। পাঁচ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ফলে তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।
শ্রম আইনে প্রায় ৯৩টি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলোও রয়েছে। আমরা চাই, তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া যেন সময়মতো শুরু ও সম্পন্ন হয়। শ্রমিকদের আন্দোলনে নামার আগেই মালিক ও সরকারপক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কেউ কেউ শ্রমিকদের অসন্তোষ ও গণতান্ত্রিক দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। আমরা চাই, মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক হোক। শ্রমিকদের দাবি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হোক ও মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত কীসের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে। আমরা আশা করি, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের প্রথম পোশাক খাতের মজুরি বোর্ড অতীতের মতো একপক্ষীয় হবে না। অতীতে অনেক সময় দেখা গেছে, তিন পক্ষ থাকলেও কার্যত তারা একপক্ষের মতো আচরণ করেছে। এবার যেন তা না হয়। শ্রমিকরা মাঠে নামার আগেই তাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি বাঁচার মতো ও মর্যাদাপূর্ণ মজুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: পোশাক শিল্প মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তার কারণে একসঙ্গে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন কঠিন। মালিকদের এ যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
তাসলিমা আখতার: এটা ঠিক যে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতির ভিত দুর্বল হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাবও আমাদের অর্থনীতিতে পড়েছে।
তবে এসব বিবেচনার পরও আমরা মনে করি, পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ মজুরি দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। শ্রমিকরা ভালো থাকলে, তাদের পরিবার নিয়ে সুস্থ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হলে তার ইতিবাচক প্রভাব শিল্পের পরিবেশ ও উৎপাদনশীলতার ওপর পড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনধারণের উপযোগী মজুরি না দিয়ে তাদের শুধু টিকে থাকার মতো অবস্থায় রাখা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য ভালো হবে না। অতীতে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি মালিকপক্ষের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তাদের তা পরিবর্তন করতে হবে। শ্রমিকদের মর্যাদা দেওয়া ও শিল্পে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়। এ সুবিধার ওপর নির্ভরতা কি দীর্ঘমেয়াদে শিল্পটির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে? কম মজুরির পরিবর্তে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ কতটা রয়েছে?
তাসলিমা আখতার: অটোমেশন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সারা বিশ্বেই বাড়ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশও বিশ্ববাজারের বাইরে নয়। ফলে নতুন প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নতুন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে বিষয়টি শুধু পোশাক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের অর্থনীতি এখনও অনেক বেশি পোশাক শিল্পনির্ভর। অথচ দেশে আরও অনেক শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশীয় বাজারকে সচল করা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ও অটোমেশনের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। এ বাস্তবতায় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে শ্রমিকরা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন। একই সঙ্গে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: দীর্ঘদিন ধরে মজুরি নিয়ে অসন্তোষ, কর্মবিরতি ও শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি ও মালিকদের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের ত্রিপক্ষীয় মজুরি আলোচনা কতটা কার্যকর হতে পারে?
তাসলিমা আখতার: শ্রমিকদের গণতান্ত্রিকভাবে দাবি উত্থাপনের অধিকার রয়েছে। সাধারণত মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকরা তাদের দাবি তুলে ধরেন। দাবি যথাযথভাবে বিবেচিত না হলে অসন্তোষ তৈরি হয় ও অনেক সময় শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি, কেউ কেউ শ্রমিকদের অসন্তোষকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আমরা আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করা বা তাদের গণতান্ত্রিক দাবিকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা কাম্য নয়।
আমরা মনে করি, শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। তবে সেই আন্দোলনের সুযোগ যেন অন্য কেউ নিতে না পারে, সে বিষয়ে শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে মালিকপক্ষ ও সরকারকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হবে। তাই ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে তিন পক্ষের প্রতিনিধিদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং আলোচনায় কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নির্বিচারে ছাঁটাই বন্ধ ও কালো তালিকাভুক্তির মতো অভিযোগের সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
তাসলিমা আখতার: ২০২৪ সালে গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে শ্রম সংস্কার কমিশনেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেখানে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, চাকরিচ্যুতির ঝুঁকি এবং শ্রমিক অধিকার সুরক্ষার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শ্রম সংস্কার কমিশন থেকে এ বিষয়ে বেশকিছু প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে শ্রম আইনের সংশোধন হয়েছে। প্রায় ৯৩টি ধারায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আইনি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন আইনে ২০ জন শ্রমিকের উদ্যোগে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান করা হয়েছে। কালো তালিকাভুক্তির বিষয়টিও সংজ্ঞায়িত করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যৌন নিপীড়ন, সহিংসতা ও বৈষম্য প্রতিরোধের বিষয়েও বিধান যুক্ত হয়েছে।
নতুন শ্রম আইনের অনেকগুলো পরিবর্তনই শ্রমিকদের স্বার্থের পক্ষে। গণ-অভ্যুত্থানের কারণেই এসব পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আইন সংশোধন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠকদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের অসন্তোষ অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা, নতুন ক্রয়াদেশ এবং বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের অবস্থানের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
তাসলিমা আখতার: আমাদের দেশে শ্রমিক আন্দোলনের একটি নিজস্ব ধরন রয়েছে। অনেক সময় আন্দোলন শুরু হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি দেশের বাস্তবতারই একটি অংশ। তবে বিদেশি ক্রেতারা শুধু শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে, এ কারণে ক্রয়াদেশ বন্ধ করে দেবেন— বিষয়টি এমন নয়।
ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনেন। কিন্তু পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাদের দায়িত্ব রয়েছে। পোশাকের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ এ শিল্পের মুনাফার একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও ভোগ করেন। শুধু বাংলাদেশের মালিক বা সরকারকে দায়ী করে শ্রমিকদের দুর্দশার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। এ সময় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য বৃদ্ধি এবং ন্যায্য ক্রয়ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তাদের ভূমিকা রয়েছে। শুধু ক্রয়াদেশ বন্ধের হুমকি না দিয়ে কীভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে তাদের ভাবতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মালিক পক্ষকেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকারের এখন কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
তাসলিমা আখতার: সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক দাবিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা ও সেগুলো মজুরি বোর্ডের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা। কেউ শ্রমিকদের আন্দোলন বা গণতান্ত্রিক দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে তা চিহ্নিত করতে হবে। তবে এ অজুহাতে শ্রমিকদের হয়রানি করা যাবে না। বরং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
মজুরি নির্ধারণের যে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, তা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হলে আবার শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কেউ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার সুযোগ পেতে পারে। তাই সরকারের উচিত শ্রমিকদের আস্থায় নেওয়া, মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করা এবং নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এ শিল্পে স্থিতিশীলতা ও সুস্থ কর্মপরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।