এলপিজিতে ভারতের ভর্তুকি, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রিমিয়াম গ্যাস তথা এলপিজির বাজারে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড চাহিদার মাত্র ১ শতাংশ সরবরাহ করে। বাকি ৯৯ শতাংশই বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই দামও নির্ভর করে কোম্পানিগুলোর এলপিজি সরবরাহের ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই।

যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে এলপিজির বাজার পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। দেশটিতে এলপিজির বাজার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ইন্ডিয়ান ওয়েল করপোরেশনের বাজার শেয়ার ৪৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, ভারত পেট্রোলিয়ামের শেয়ার ২৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়ামের দখলে ২৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। এতে বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এছাড়া এলপিজিতে ভারত সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে থাকে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এক মাসের মধ্যে দুই দফা বাড়ানো হয়েছে এলপিজির দাম। সেপ্টেম্বরে দেশে সরকারিভাবে নির্ধারিত এলপিজির দাম ছিল ১২ কেজি ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ৪ অক্টোবর তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। আর ২ নভেম্বর আরেক দফা দাম বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ৬০ টাকা। অর্থাৎ ২৮ দিনের ব্যবধানে ১২ কেজি এলপিজির দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা প্রায় ৩০ শতাংশ।

যদিও সারা দেশে কোথাও সরকারের নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা বা আশপাশে ১২ কেজির এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে এ নিয়ে কোনো বাজার মনিটরিং নেই। সরকারের পক্ষে দাম নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।

ভারতে এলপিজির বাজার পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় এলপিজির বাজারও সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখানে দাম রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করা হয়। এলপিজির বাজারে বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক অনেক কম। ফলে দামের ওপর বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রভাব খুবই সীমিত। এছাড়া সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও গ্রাহক পর্যায়ে তার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে ভর্তুকি দেওয়া হয়।

এলপিজিতে ভর্তুকিতে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশটিতে সাধারণত এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার হয় ১৪ দশমিক ২ কেজির। এগুলোর সরবরাহ ব্যয় ১ হাজার ৬০০ রুপি। তবে দিল্লিতে ১৪ দশমিক ২ কেজি এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম ৯৪২ রুপি। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে ৬৫৮ রুপি। আর বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে ১২ কেজি এলপিজির দাম পড়ছে ৭৯৬ রুপি বা ১ হাজার ৪৫ টাকা।

যদিও ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে জ্বালানির দাম ভিন্ন ভিন্ন হয়। মূলত রাজ্য সরকারের কর ও ভ্যাট হারের ভিন্নতার কারণে এমনটি হয়। এক্ষেত্রে বর্তমানে কলকাতায় ১৪ দশমিক ২ কেজি এলপিজির দাম ৯৬৮ রুপি। এতে ১২ কেজি এলপিজির দাম পড়বে ৮১৮ রুপি বা ১ হাজার ৭৪ টাকা। তবে ভারতে এলপিজির ভর্তুকিতেও ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।

মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এলপিজিতে বিশেষ ভর্তুকি দেয় ভারত সরকার। এজন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৬ সালে ‘উজ্জ্বল প্রকল্প’ চালু করে। এর আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে এলপিজিতে বাড়তি ভর্তুকি দেওয়া হয়। এতে বছরে চারটি সিলিন্ডারে মোট ১ হাজার ২০০ রুপি বাড়তি ভর্তুকির ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ৩০০ রুপি করে বছরে চারটি সিলিন্ডারে বাড়তি ভর্তুকি দেওয়া হয়।

আবার ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এলপিজিতে বিশেষ ব্যবস্থার ঘোষণা দেন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরই। এর আওতায় যেসব পরিবারের বার্ষিক মাথাপিছু আয় আড়াই লাখ রুপির কম তারা বছরে তিনটি এলপিজি সিলিন্ডার ফ্রি পাবে। মূলত এলপিজি কেনার পর ওই পরিবারের নারী প্রধানের ব্যাংক হিসাবে এর দাম ফেরত দেওয়া হয়।

একইভাবে বাংলাদেশে এলপিজি দাম বৃদ্ধির সমালোচনার মধ্যে ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২৭ এপ্রিল তিনি এ ঘোষণা দিলেও গত ছয় মাসে তা কার্যকর হয়নি।

এদিকে শুধু ভারত নয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এলপিজির দাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। এর মধ্যে নেপাল ও ভুটানে ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। নেপালে এর দাম ২ হাজার ৬০ নেপালি রুপি ও ভুটানে ১ হাজার ৩৯ ভারতীয় রুপি। এ হিসাবে নেপালে ১২ কেজি এলপিজির দাম পড়ে ১ হাজার ৭৪১ নেপালি রুপি বা ১ হাজার ৪২৮ টাকা। আর ভুটানে দাম পড়ে ৮৭৮ রুপি বা ১ হাজার ১৫৩ টাকা।

পাকিস্তানে সাধারণত গ্রাহক পর্যায়ে ১১ দশমিক ৮ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। নভেম্বর মাসে এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৭০ পাকিস্তানি রুপি। এ হিসাবে পাকিস্তানে ১২ কেজি এলপিজির দাম পড়ে ৩ হাজার ৫২৮ রুপি বা ১ হাজার ৫৮৮ টাকা। আর শ্রীলঙ্কায় সাধারণত সাড়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, যার দাম ৪ হাজার ৩৬৫ শ্রীলঙ্কান রুপি। এ হিসাবে ১২ কেজি এলপিজির দাম পড়ে ৪ হাজার ১৯০ রুপি বা ১ হাজার ৫৭০ টাকা।