উপমহাদেশের প্রথম মহিলা কবির বাড়ি বেদখলের পথে
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত বসতবাড়ি ও ঐতিহাসিক শিবমন্দিরটি চরম অবহেলা ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সঠিক তদারকির অভাবে ইতোমধ্যে জবরদখল হয়ে গেছে কবির বসতবাড়িটি এবং চুরির কবলে পড়েছে মন্দিরের বহু মূল্যবান প্রত্নসম্পদ।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজকাপন ইউনিয়নের তৎকালীন ফুলেশ্বরী নদীর তীরের পাতুয়াইর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কালজয়ী এই কবি। তার পিতা দ্বিজ বংশীদাশও ছিলেন মধ্যযুগের একজন সহজিয়া-কবি এবং 'মনসামঙ্গল' কাব্যের রচয়িতা। পিতার পরামর্শে চন্দ্রাবতী চিরকুমারী থেকে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে স্থাপিত শিবমন্দিরে বসে 'রামায়ণ' রচনা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে নদীটি শুকিয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়লেও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার শিবমন্দির ও ভগ্নপ্রায় বসতবাড়ি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির ও বসতবাড়ি সংস্কার এবং সংরক্ষণের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কেবল একটি নোটিশবোর্ড ঝুলিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। অধিদপ্তরের নজরদারি না থাকায় ইতোমধ্যে মন্দির থেকে ঐতিহাসিক শিবলিঙ্গসহ বহু মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। ১৯৯১ সালের এক সাম্প্রদায়িক হামলায়ও মন্দিরটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। বর্তমানে ষোড়শ শতাব্দীর স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন কবির বাড়িটি পরগাছা উদ্ভিদের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকারও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবে সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য নতুন করে কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

ঐতিহাসিক ও স্থানীয় অনুসন্ধান মতে, অষ্টকোণাকৃতির এই শিবমন্দিরটি ১৬শ শতকের শেষভাগে নির্মিত। ১১ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এই মন্দিরের নিচে একটি কক্ষ ও কারুকার্যখচিত কুলুঙ্গি রয়েছে। আগে এখানে পোড়ামাটির অসংখ্য চিত্রফলকের অলংকরণ থাকলেও এখন আর তার কোনো অবশিষ্ট নেই। কয়েক বছর আগে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ সংস্কার ও চুনকাম করায় এর প্রাচীন আমেজ অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে বলে দর্শনার্থীরা জানান।

মৈমনসিংহ গীতিকার নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত 'চন্দ্রাবতী পালা' অনুযায়ী, ১৫৫০ সালের দিকে জন্ম নেওয়া এই কবি একাধারে যেমন স্রষ্টা, তেমনি বাস্তব জীবনের এক ট্রাজিক নায়িকা। বাল্যসখা ও প্রেমিক জয়ানন্দের বিশ্বাসভঙ্গ ও অন্য এক নারীকে বিয়ের খবরে মর্মাহত হয়ে চন্দ্রাবতী আমৃত্যু শিবের আরাধনা ও সাহিত্য সাধনায় মগ্ন হন। পরবর্তীতে অনুতপ্ত জয়ানন্দ ফিরে এলেও চন্দ্রাবতী তার সাথে আর সাক্ষাৎ করেননি। এই অভিমানে জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলে, বিরহী চন্দ্রাবতীও একই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেন। ফলে তার রামায়ণ রচনা সীতার বনবাস পর্বের পর আর সমাপ্ত হতে পারেনি।

কবির স্মৃতিকে ধরে রাখতে স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে 'চন্দ্রাবতী স্মৃতি সংসদ' এবং মন্দিরসংলগ্ন স্থানে স্থাপিত হয়েছে 'কবি চন্দ্রাবতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে এই বিদ্যালয় মাঠে ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে আসেন। বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য কীর্তি ও প্রথম নারী কবির স্মৃতি রক্ষার্থে দ্রুত জবরদখলমুক্ত করে পুরো এলাকাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও এলাকাবাসী।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি