সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: সরকার সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় করছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর ৬৩ শতাংশই থাকছে সহায়তার বাইরে! অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ১৮ শতাংশ পাচ্ছে এসব সুবিধা। তাহলে সরকারি সহায়তা যাচ্ছে কোথায়? সামাজিক নিরাপত্তায় ৬৩ শতাংশ দরিদ্রই বাদ।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ৯০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। ২০২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ। তবে বরাদ্দের প্রায় ৪৩ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও কৃষি ভর্তুকিতে।

সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈষম্য। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ উপকারভোগী বছরে গড়ে ১০ হাজার ৪৭২ টাকা পেলেও সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পাচ্ছে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার চালু করেছে ফ্যামিলি কার্ড। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচিত পরিবারের একজন নারী সদস্য মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অর্থাৎ বছরে ৩০ হাজার টাকা পাবেন। প্রথম ধাপে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মডেলিং অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্য নির্ধারণ আরও নির্ভুল হলে প্রায় ২০ দশমিক ৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। আর বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর সমন্বিত সংস্কার করা গেলে এ সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৮ দশমিক ৫ লাখে।

এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার লক্ষ্যভ্রষ্টতা কমাতে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও অর্থ বিভাগ যৌথভাবে ডায়নামিক সোশিয়্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর) তৈরি করছে। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, ফ্যামিলি কার্ড এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচিতে এটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্য জুন ২০২৮।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, কর্মসূচি একীভূত করতে গিয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সুরক্ষা দুর্বল করা যাবে না। দুর্যোগ ও মূল্যস্ফীতির সময় দ্রুত খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, ভর্তুকি কমানোর আগে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি, যাতে বাড়তি দামের চাপ দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর না পড়ে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও অদূর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দরিদ্র মানুষের ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত শুধরে দেওয়া সহজ হবে না। দেশের চলমান আর্থিক টানাপড়েনের কারণে সরকারি কর্মসূচিগুলোতে এক লাফে বাজেট বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। ফলে নতুন করে বরাদ্দ না বাড়িয়ে বিদ্যমান সম্পদ ও কাঠামোর দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের জন্য আরও ভালো সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে।’

পরিসংখ্যান বলছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিপুল বরাদ্দ থাকলেও সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, প্রয়োজন সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, কর্মসূচির সমন্বয় এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা। কারণ সরকারি সহায়তার প্রকৃত সাফল্য বরাদ্দের অঙ্কে নয়, বরং কতজন প্রকৃত দরিদ্র মানুষের জীবন বদলাতে পারল, তার ওপরই নির্ভর করছে।  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি