জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
বাংলাদেশের ঠিক পাশের একটি দেশ। যেখানে চলছে গৃহযুদ্ধ, সামরিক সংঘাত আর রোহিঙ্গা সংকট। সেই মিয়ানমারই এবার রাশিয়ার সহযোগিতায় এগোচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-এই পারমাণবিক কর্মসূচি কি শুধুই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য? নাকি এর আড়ালে রয়েছে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা? মিয়ানমার কি গোপনে পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টা করছে? আর সত্যিই যদি এমন কিছু ঘটে, বাংলাদেশের সামনে কী ধরনের নিরাপত্তা-ঝুঁকি তৈরি হতে পারে?
রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি: সন্দেহের শুরু কোথায়?
মিয়ানমারের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সহযোগিতা বাড়ার পর। ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সহযোগিতার চুক্তি হয়। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে ১১০ মেগাওয়াটের একটি ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর প্রকল্প নিয়ে চুক্তি করে মিয়ানমার ও রাশিয়া। পরিকল্পনায় রয়েছে দুটি ৫৫ মেগাওয়াটের রিঅ্যাক্টর। অর্থাৎ, মিয়ানমার যে পারমাণবিক প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, সেটি বাস্তব।
কিন্তু এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা মানেই পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা থাকা নয়। বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পের লক্ষ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন। আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিশেষ উপাদান এবং জটিল অবকাঠামো। তাই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিকে সরাসরি বোমা তৈরির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
উত্তর কোরিয়ার যোগসূত্র: অভিযোগ কতটা সত্য?
মিয়ানমারের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহের আরেকটি উৎস উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক যোগাযোগের অভিযোগ। ২০০৯ সাল থেকেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং গোপনে সামরিক প্রযুক্তি আদান-প্রদানের অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে সামরিক যোগাযোগের অভিযোগ আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রমাণ এক বিষয় নয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের দেশভিত্তিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, মিয়ানমারের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। অর্থাৎ, সন্দেহ রয়েছে; অতীতের অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা কতটা যাচাই করা সম্ভব?
আন্তর্জাতিক নিয়ম কী বলছে?
আন্তর্জাতিক নিয়মের দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি-এনপিটি বা নন-প্রলিফারেশন ট্রিটির সদস্য। দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রাখার ব্যাংকক চুক্তিরও সদস্য। এই আঞ্চলিক চুক্তি অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলোর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, অর্জন, মজুত ও পরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অর্থাৎ, মিয়ানমার যদি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোয়, তাহলে তা শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয় হবে না; আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। তবে চুক্তির সদস্য হওয়া বা কোনো প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকাই অস্ত্র তৈরির প্রমাণ নয়। এজন্য প্রয়োজন, যাচাইযোগ্য তথ্য ও স্বাধীন মূল্যায়ন।
বাংলাদেশের সামনে কী বিপদ?
এখন প্রশ্ন হলো, মিয়ানমার পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ালে বাংলাদেশের কী হতে পারে? প্রথমত, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চাপ। দুদেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা বা নতুন কোনো সংকট তৈরি হলে মিয়ানমারের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি দিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার কোনো প্রমাণিত পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত দেখানো যায় না।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এমনিতেই জটিল। মিয়ানমারের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পেলে আঞ্চলিক কূটনীতির হিসাব আরও কঠিন হতে পারে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই প্রত্যাবাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে-এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়।
তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব। বঙ্গোপসাগরে চীন, ভারতসহ বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ রয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে বাংলাদেশের নৌ-নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
আরেকটি বিষয়-পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সীমান্ত পেরিয়ে পরিবেশগত প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে মিয়ানমারে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে বা বাংলাদেশ সরাসরি তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকিতে রয়েছে-এমন দাবি করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সীমান্তের দৃশ্য থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের মানচিত্রে জুম আউট
মিয়ানমার গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে-এমন দাবি এখনই নিশ্চিতভাবে করার সুযোগ নেই। রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে, আর অতীতের কিছু সামরিক যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহও রয়েছে। কিন্তু এই দুই বিষয় এক করে অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
মিয়ানমারের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সন্দেহ নয়, চাই নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সতর্কতা
বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি হলো-গুজব নয়, নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি। কারণ, মিয়ানমারের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো-প্রতিবেশী দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি