জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের ওপর ‘জিআই’ সিল থাকা মানেই সেটির দাম ও চাহিদা এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া। চীন যেখানে প্রায় ১০ হাজার পণ্যকে এই সুরক্ষায় নিয়ে এসেছে, সেখানে শত শত ঐতিহ্যের দেশ বাংলাদেশ কেন এখনো শতক পার হতে পারেনি? আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই কোটি ডলারের সুযোগ আমরা কেন হারাচ্ছি?
জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন বা জিআই কেবল একটি শংসাপত্র নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মৌলিকতা ও আভিজাত্যের প্রতীক।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে চীন, ভারত এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জিআই-কে ব্যবহার করছে তাদের রপ্তানি বাড়ানোর প্রধান অস্ত্র হিসেবে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক- কেবল হস্তনির্মিত কার্পেটের জন্যই ইরানের রয়েছে ৪৫টি আলাদা আন্তর্জাতিক জিআই নিবন্ধন, যা দিয়ে তারা বিশ্বের ৬৫টি দেশে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য করছে। চীন তাদের প্রায় ১০ হাজার স্থানীয় পণ্যকে জিআই সুরক্ষায় এনে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে নিজেদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।
অন্যদিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। ২০১৫ সালে জামদানি দিয়ে যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ এক দশকে আমাদের নিবন্ধিত জিআই পণ্যের সংখ্যা সবেমাত্র ৬৪টিতে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা তখনই তৎপর হই যখন অন্য কোনো দেশ আমাদের পণ্যের ওপর দাবি তুলে বসে- যেমনটি ঘটেছিল জামদানি কিংবা টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রে।
প্রতি বছর প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে যখন দেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন জিআই পণ্যের এই আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম বাজার ধরতে না পারা আমাদের এক বিশাল নীতিগত ব্যর্থতা।
বিশ্ববাজার ধরতে হলে শুধু সনদে আটকে থাকলে চলবে না, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ:
প্রথমত, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ১০০টি সম্ভাবনাময় পণ্যকে জিআই নিবন্ধনের আওতায় আনার দ্রুতগতির বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিসিক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করে সরাসরি বিদেশে রপ্তানির পথ তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিদেশি ক্রেতা ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে রাজধানীতে একটি বিশ্বমানের ‘জাতীয় জিআই এম্পোরিয়াম’ গড়ে তোলা জরুরি।
সবচেয়ে বড় বিষয়, বাড়তি আয়ের সুফল যেন সরাসরি পান প্রান্তিক কারিগর, তাঁতি ও চাষিরা- মধ্যস্বত্বভোগীরা যেন এই ব্র্যান্ড ভ্যালু কুক্ষিগত করতে না পারে।
ফরাসি পারফিউম, সুইস চকলেট কিংবা চীনা সিল্কের মতোই বিশ্বনন্দিত হওয়ার পুরো শক্তি রয়েছে বাংলাদেশের জামদানি, নকশিকাঁথা কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের। দরকার শুধু সঠিক উদ্যোগ ও আগ্রাসী বৈশ্বিক কূটনীতি। আমাদের ঐতিহ্যই হোক আগামীর রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
জিআই পণ্য কী? কেন এতে বাংলাদেশ পিছিয়ে?
সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি কিংবা ফ্রান্সের পনির বিশ্বজুড়ে এত দামি কেন? কারণ তাদের রয়েছে ‘জিআই সনদ’। চীন একাই প্রায় ১০ হাজার পণ্যের জিআই স্বত্ব নিয়ে রপ্তানি বাজার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর শত শত ঐতিহ্যের বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ৬৪! ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি হাজার কোটি ডলারের বিশ্ববাজার ধরতে এখনই কি আমাদের জিআই ব্র্যান্ডিংয়ে গতি বাড়ানো উচিত নয়?
জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ির আসল বাজার কত বড়?
ইরান কেবল তাদের কার্পেটের ৪৫টি জিআই ভ্যারিয়েন্ট দিয়ে ৬৫টি দেশে ব্যবসা করছে! অথচ আমাদের জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ির মতো বিশ্বমানের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা সঠিক আন্তর্জাতিক বিপণন করতে পারছি না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে জিআই পণ্যই হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম বড় হাতিয়ার। আপনার এলাকায় এমন কোন ঐতিহ্যবাহী পণ্য আছে যা দ্রুত জিআই স্বীকৃতি পাওয়া উচিত? কমেন্টে জানান!
—জা. অর্থনীতি/এলএটি