জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন। হাতে মোবাইল, চোখ স্ক্রিনে। একের পর এক বিষয় মিলিয়ে দেখছেন। সব ঠিকঠাক! কিন্তু হঠাৎ একটি বিষয়ে চোখ আটকে গেল। ফলাফল; অকৃতকার্য! এক মুহূর্তেই যেন সব আনন্দ মাটি। বন্ধুরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেবে, তখন তাকে আবার বই খুলে বসতে হবে। পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের স্বপ্ন; সবকিছু নিয়েই শুরু হবে নতুন দুশ্চিন্তা। কিন্তু একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার জন্য কি সত্যিই পুরো একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর বদলে দিতে পারে সরকারের একটি নতুন উদ্যোগ। পরিকল্পনা হচ্ছে, এসএসসি ও এইচএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া। আর চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিন বা তার বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে লাগতে পারে তিন মাস পর্যন্ত। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কারা সুযোগ পাবেন, কতটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারবেন, কবে পরীক্ষা হবে এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
১২ অক্টোবর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা অন্তর্বর্তী পরীক্ষা চালুর বিষয়ে মত দিয়েছেন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল ফল প্রকাশের পর এক মাস চলবে খাতা পুনর্নিরীক্ষণ। এরপর পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, পরীক্ষার রুটিন তৈরি, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং নতুন ফল প্রকাশের ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে। দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া দুই মাসে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিন বা তার বেশি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হলে সময় লাগতে পারে তিন মাস পর্যন্ত।
এবার প্রশ্ন, এই উদ্যোগ চালু হলে শিক্ষার্থীদের লাভটা কোথায়? ধরুন, একজন শিক্ষার্থী দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। তার বন্ধুরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাকে হয়তো আবার সেই দুটি বিষয় নিয়েই পড়তে হচ্ছে। অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য। এতে শুধু সময় নষ্ট হয় না, পিছিয়ে যেতে পারে তাঁর উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পরিকল্পনাও।
কিন্তু নতুন উদ্যোগ চালু হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। পুরো এক বছর অপেক্ষা না করে কয়েক মাসের মধ্যেই আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন তিনি। পাস করতে পারলে দ্রুত উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে ফিরতে পারবেন। কমতে পারে দীর্ঘ অপেক্ষার মানসিক চাপ, পাশাপাশি কমতে পারে অতিরিক্ত কোচিং, যাতায়াত ও পড়াশোনার পেছনে পরিবারের বাড়তি খরচও।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে একজন শিক্ষার্থীর অন্য বিষয়গুলোর প্রস্তুতি কিংবা অর্জন তো মুছে যায় না! তাই শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকলে তাকে নতুন করে সব বিষয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে না। এতে দুর্বল বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ঠিক কতটি বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত নীতিমালার ওপর।
সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ, একটি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পেলেও একজন শিক্ষার্থীর মেধা, দক্ষতা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। তবে এই সুযোগ সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হলে সময়মতো পরীক্ষা নেওয়া, দ্রুত ফল প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করাও জরুরি। তাহলেই দ্বিতীয় সুযোগটি শুধু আরেকটি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ হয়ে থাকবে না, বরং শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পথও তৈরি করতে পারবে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি উপলব্ধি। একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে খারাপ ফল করলেই তার সব মেধা, স্বপ্ন কিংবা সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। গত ১০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। তিনি আরও বলেন, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। তিনি জানান, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। এসব শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের পথ তৈরির বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল ২৫ থেকে ২৯ অক্টোবরের মধ্যে প্রকাশের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এটি প্রস্তাবিত সময়সীমা, চূড়ান্ত ঘোষিত তারিখ নয়। গত ২ জুলাই শুরু হয়েছিল এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ৮ আগস্ট, আর ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হয় ১৫ আগস্ট। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল ২ হাজার ৬৯৭টি, আর অংশ নিয়েছে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফল প্রকাশের পর পুনঃপরীক্ষার আয়োজন করা বড় ব্যবস্থাপনার কাজ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময়সূচির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পরীক্ষার ফল যেন শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনে কাজে লাগে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তাই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগের পরিধি, পরীক্ষার নিয়ম ও সময়সূচি; সবকিছুই নির্ভর করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। এখন দেখার বিষয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাদের জন্য, কতটি বিষয়ে এবং কবে থেকে এই অন্তর্বর্তী পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি