জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: প্রতিদিন সড়কে নামছেন লাখো মানুষ। কেউ যাচ্ছেন কর্মস্থলে, কেউ ফিরছেন বাড়িতে, কেউবা ছুটছেন জরুরি প্রয়োজনে। কিন্তু নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কতটা? গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার। আইন হয়েছে, প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কিন্তু থামেনি মৃত্যুর মিছিল। এবার দুর্ঘটনা কমাতে আসছে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন। প্রশ্ন হলো, নতুন এই উদ্যোগ কি সত্যিই বদলাতে পারবে দেশের সড়কের চিত্র?
বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ৩৩ হাজার ৬২৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৫ হাজার ১৮৪ জন। আহত হয়েছেন আরও ৫৯ হাজার ৯৮৫ জন। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায়। গত মঙ্গলবারের ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৪ জনের, আহত হয়েছেন ৩০ জন।
এমন পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, সারা দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য-‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০১৮ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল সড়ক পরিবহন আইন। তবে দুর্ঘটনা কমেনি। এবার সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে তৈরি হচ্ছে নতুন আইনের খসড়া ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৭’। খসড়াটি শিগগিরই মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রস্তাবিত আইনে রয়েছে ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা ও দুটি তফসিল। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা বিনা মূল্যে নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনাকবলিত মানুষকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং ট্রাফিক আইন ভাঙলে চালকের লাইসেন্সে ডিমেরিট পয়েন্ট কাটার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ বারবার করলে দ্বিগুণ শাস্তি বা জরিমানার প্রস্তাবও রয়েছে।
খসড়ায় চালকের জন্য গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার, ধূমপান, খাবার খাওয়া ও উচ্চশব্দে গান শোনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো নিষিদ্ধের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহীর জন্য বিএসটিআই অনুমোদিত মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের মোটরসাইকেলের যাত্রী হিসেবে চলাচলও নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপার বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। ফুটপাত ব্যবহার না করলে প্রথমবার সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রণে ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, রাম্বল স্ট্রিপ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ৩ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা, যা ৩৫৮ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন ও প্রকল্প দিয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। বুয়েটের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হকের মতে চালকদের প্রশিক্ষণের আগে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া ঠিক করা জরুরি।
সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ-আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। নতুন আইন সেই পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি