প্রযুক্তি ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রসার বাড়লেও এর পেছনে বড় ধরনের ব্যর্থতার চিত্র বেরিয়ে এসেছে। প্রয়োজনীয় পুঁজির ঘাটতি, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বিগত কয়েক বছরে বহু বড় প্রজেক্ট ও স্টার্টআপ বন্ধ হয়ে গেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নেওয়া প্রায় ৪২ শতাংশ এআই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে মাঝপথেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্বে এই ব্যর্থ প্রজেক্টগুলো এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘এআই গ্রেভইয়ার্ড’ বা এআইয়ের কবরস্থান হিসেবে।
এই ব্যর্থতার তালিকায় কেবল ছোট স্টার্টআপ নয়, রয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর বহু আলোচিত প্রজেক্টও। ওপেনএআই গত মার্চ মাসে তাদের ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘সোরা’র কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। উচ্চ অপারেটিং খরচ এবং ব্যবহারকারী ধরে রাখতে না পারার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি এই সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া ওপেনএআই তাদের এআই ব্রাউজার ‘অ্যাটলাস’ এবং সহকারী ‘অপারেটর’ বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোর ফিচার সরাসরি মূল চ্যাটজিপিটি অ্যাপের ভেতরে যুক্ত করেছে।
অন্যদিকে, চ্যাটবট প্ল্যাটফর্ম ‘ক্যারেক্টার এআই’ প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় দেউলিয়া ঘোষণা করার আবেদন করেছে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীদের বিখ্যাত ও কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিলেও, কিশোরদের মানসিক ক্ষতি ও নানামুখী আইনি জটিলতার মুখে এটি বড় সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, কোম্পানিটি দেউলিয়া প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ডিজনি মাত্র ২০ কোটি ডলারে এর কিছু অংশ কেনার প্রস্তাব দেয়।
ব্যর্থতার এই তালিকায় নাম রয়েছে বেশ কিছু আলোচিত গ্যাজেট ও সফটওয়্যারেরও। এর মধ্যে ‘হিউম্যান এআই পিন’ অন্যতম। স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে পরিধানযোগ্য এই এআই ডিভাইস তৈরিতে কোম্পানিটি প্রায় ২৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু ডিভাইসের নিম্নমানের কার্যকারিতা এবং ব্যাটারিতে আগুন লাগার ঝুঁকির মতো গুরুতর সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটি তাদের এআই পিন ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময় এর বেশিরভাগ সম্পদ এইচপির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে ‘রেবিট আর১’ ডিভাইসটিকেও। ব্যাপক প্রচারের পর বাজারে আসা এই গ্যাজেটটি অসম্পূর্ণ ফিচার ও দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে ব্যবহারকারীদের টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়।
সফ্টওয়্যার এবং অটোমেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। জ্যাপিয়ারের বিকল্প হিসেবে তৈরি এআই অটোমেশন টুল ‘রিল’ বড় বড় প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের সিস্টেমে একই ধরনের সুবিধা নিয়ে আসায় প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে গত আগস্টে বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে এআই-নির্ভর ইমেইল অর্গানাইজার ‘নশন মেইল’ এবং লেখা থেকে পডকাস্ট তৈরি করার এআই অ্যাপ ‘হুক্সে’ বন্ধ হয়ে গেছে। অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টেরাও এআই প্রজেক্ট নিয়ে বিপাকে পড়েছে। অ্যাপল তাদের আইফোনের উন্নত সিরি ফিচারের কাজ বারবার পিছিয়ে দেওয়ায় আইনি বিরোধ ও ক্ষতিপূরণের মুখে পড়ে। অন্যদিকে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ পিসির জন্য আনা ‘রিকল’ ফিচারটি ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও তথ্য চুরির আশঙ্কার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত রাখতে হয়।
এআই খাতে বিনিয়োগের কোনো কমতি না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সঠিক ব্যবসায়িক মডেল বা গ্রাহকের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করতে না পারলে কেবল প্রচারসর্বস্ব উদ্যোগ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ‘এআই গ্রেভইয়ার্ড’-এর এই ক্রমবর্ধমান তালিকা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির বাজারে টিকে থাকতে হলে কেবল নতুন উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়, বরং ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা এবং বাস্তবসম্মত উপযোগিতাই মূল বিষয়।