আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। সামনে আরও বিক্ষোভ কর্মসূচি রয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরতে পারে এবং সরকারের পরিকল্পিত বাজেট সাশ্রয়ের লক্ষ্য অর্জন কঠিন করে তুলতে পারে।
বাজেট পাস করাতে পারবে কি সরকার?
সিএনবিসি জানিয়েছে, ফ্রান্স সরকার ২০২৭ সালে বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। চলতি বছরে এই ঘাটতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাজস্বসংক্রান্ত বাজেট প্রস্তাব নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদে আবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। তবে বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা এসব পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন।
ন্যাটিক্স সিআইবির অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান অ্যালাঁ দুরে বলেন, ঋণ নেওয়ার ব্যয় যাতে দ্রুত বেড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
সরকার বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে সংবিধানের ৪৯.৩ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করতে পারে। এ বিধান অনুযায়ী, চূড়ান্ত ভোট ছাড়াই কোনো বিল পাস করানো সম্ভব, যদি না আইনপ্রণেতারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস করেন। এ ছাড়া নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেও সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে।
দুরের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমাতে ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। সরকারি বন্ডের ওপর সাম্প্রতিক চাপের পেছনে মূলত বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের কৌশল কাজ করছে। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ধরে রাখেন এমন বিনিয়োগকারীরা এখনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার ১১ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহারের সঙ্গে ইউরোজোনের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত জার্মানির সমপর্যায়ের বন্ডের সুদহারের ব্যবধান ২০১১ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।
আইএনজির ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডবিষয়ক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শার্লট দ্য মন্টপেলিয়ে বলেন, চলমান অস্থিরতা ফ্রান্সের বাজেট ও রাজনীতি নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগের সঙ্গে নতুন অনিশ্চয়তা যুক্ত করেছে। এতে এমন ধারণাও জোরালো হচ্ছে যে ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও ব্যয় সাশ্রয়ের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা তার জন্য কঠিন হবে।
ইবুরির বাজার কৌশল বিভাগের প্রধান ম্যাথ্যু রায়ান বলেন, ২০২৭ সালের বাজেট শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টে পাস হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পাস হলেও বাম ও ডান উভয় পক্ষের দাবির মুখে সরকারকে এত বেশি ছাড় দিতে হতে পারে যে, বাজেট ঘাটতির মূল সমস্যার যথাযথ সমাধান হবে না।
প্রবৃদ্ধিতে কতটা প্রভাব পড়বে?
আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা আরও বিক্ষোভের আহ্বান জানাচ্ছেন। স্বল্পস্থায়ী অস্থিরতার প্রভাব বাজার অনেক সময় সামলে নিতে পারে। তবে মানুষের আস্থা দীর্ঘস্থায়ীভাবে কমে গেলে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। নতুন অস্থিরতা সেই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ফ্রান্সের জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে, মানুষের আস্থা আরও কমলে কিংবা বাজারে উত্তেজনা বাড়লে প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রাজনৈতিক চাপের কারণে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই বাজেট ঘাটতি বাড়বে এবং জিডিপির ৫ শতাংশে ঘাটতি নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ব্যর্থ হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কোন খাত?
গত এক মাসে ফ্রান্সের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক সিএসি ৪০-এর দরপতন হয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আইএনজির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খুচরা বিক্রয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পর্যটন এবং পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা অস্থিরতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর মধ্যেই ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস ফ্রান্সের ঋণমান ‘এএএ৩’ অপরিবর্তিত রেখেছে। মুডিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভক্তি দেশটির আইনপ্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এ কারণে ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক রাখা হয়েছে। তবে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বাজেট ঘাটতি কমাতে পারলে পূর্বাভাস স্থিতিশীল করা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।