বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা একাদশ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; ইতিহাস, আবেগ, শিল্প আর কিংবদন্তিদের জন্ম দেওয়ার এক মহামঞ্চ। এই মঞ্চে কেউ এসেছেন ক্ষণিকের ঝলক হয়ে, আবার কেউ নিজেদের নাম লিখেছেন অনন্তের খাতায়। সেইসব মহাতারকাদের নিয়েই গড়া হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা একাদশ, যেখানে প্রতিটি নামই যেন একেকটি মহাকাব্য। দুর্ধর্ষ ৪-৩-৩ ফরমেশনে সাজানো হয়েছে সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ। দেখে নেওয়া যাক ইতিহাসের এই কিংবদন্তি একাদশের তারকাদের—

গোলরক্ষক: জিয়ানলুইজি বুফন (ইতালি)
গোলপোস্টের নিচে আছেন ইতালির জিয়ানলুইজি বুফন। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষকদের একজন। ২০০৬ বিশ্বকাপে তার দৃঢ়তা ইতালিকে এনে দিয়েছিল শিরোপা। পুরো টুর্নামেন্টে ওপেন প্লে থেকে মাত্র দুটি গোল হজম করেছিল ইতালি। ক্যারিয়ারে এক হাজারের বেশি পেশাদার ম্যাচ খেলা বুফন শুধু একজন গোলরক্ষক নন, তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম।

রাইট ব্যাক: কাফু (ব্রাজিল)
রক্ষণভাগের ডান পাশে ব্রাজিলের কাফু। অফুরন্ত দৌড়, অবিশ্বাস্য স্ট্যামিনা আর আক্রমণ-রক্ষণে সমান দক্ষতায় তিনি রাইট ব্যাক পজিশনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা তিনটি ফাইনাল (১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২) খেলার অনন্য রেকর্ড তার। জিতেছেন দুটি শিরোপা। ২০০২ সালে শিরোপা হাতে তার হাসি আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। 

সেন্টার ব্যাক: ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার (জার্মানি)
মাঝের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ‘ডার কাইজার’ শুধু একজন ডিফেন্ডার ছিলেন না, ছিলেন মাঠের সম্রাট। লিবেরো পজিশনের সৌন্দর্যকে তিনি শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন, কোচ হিসেবেও জিতেছেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন কীর্তি খুব কম মানুষেরই আছে। ১৯৭৪ সালে অধিনায়ক হিসেবে পশ্চিম জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতান, পরে ১৯৯০ সালে কোচ হিসেবেও শিরোপা এনে দেন।

সেন্টার ব্যাক: ড্যানিয়েল পাসারেলা (আর্জেন্টিনা)
বেকেনবাওয়ারের সঙ্গী আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল পাসারেলা। উচ্চতায় খুব বড় না হলেও সাহস, নেতৃত্ব আর ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন অতুলনীয়। ডিফেন্ডার হয়েও ক্যারিয়ারে ১৭০টির বেশি গোল করেছিলেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়। ১৯৭৮ সালে তার নেতৃত্বেই প্রথম বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।

লেফট ব্যাক: রবার্তো কার্লোস (ব্রাজিল)
বাম পাশে রবার্তো কার্লোস। তার পায়ের শট যেন কামানের গোলা। গতি, শক্তি আর আক্রমণাত্মক মানসিকতায় তিনি ছিলেন ফুটবলের এক বিস্ময়। ফ্রি-কিক নিতে দাঁড়ালে পুরো স্টেডিয়াম নিঃশ্বাস আটকে রাখত। অবিশ্বাস্য গতি, ওভারল্যাপিং রান এবং ভয়ংকর ফ্রি-কিকের জন্য বিখ্যাত। ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল দলের অন্যতম প্রাণভোমরা ছিলেন এই কিংবদন্তি।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ড: লোথার ম্যাথাউস (জার্মানি)
মিডফিল্ডে আছেন জার্মানির লোথার ম্যাথাউস। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৫ ম্যাচ খেলার রেকর্ড এখনও তার। তিনি ছিলেন এক অবিশ্রান্ত যোদ্ধা— রক্ষণে, আক্রমণে, সর্বত্র। ১৯৯০ সালে জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে তার নেতৃত্ব ছিল অনন্য।

সেন্ট্রাল মিডফিল্ড: জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)
ম্যাথাউসের ফুটবল শিল্পের কবি জিনেদিন জিদান। বল পায়ে তার চলাফেরা যেন নৃত্য। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই গোল করে ফ্রান্সকে প্রথম শিরোপা এনে দেন। ক্যারিয়ারে শতাধিক গোলের চেয়েও বড় ছিল তার খেলার সৌন্দর্য, যা ফুটবলকে শিল্পে রূপ দিয়েছিল। তার অসংখ্য স্মরণীয় পারফরম্যান্স আধুনিক প্লেমেকারের সংজ্ঞাই বদলে দেয়।

অ্যাটাকিং মিডফিল্ড: দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা)
আর মাঝমাঠের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ছিল যেন তার একক মহাকাব্য। ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’— সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের এক পৌরাণিক চরিত্র। তার ড্রিবলিং, দৃষ্টি আর নেতৃত্ব আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে।

রাইট উইং: লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)
আক্রমণ ভাগে ডান পাশে আছেন লিওনেল মেসি। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ প্রতিভাদের একজন। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৯০০-এর বেশি গোল করা মেসি বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোল অবদানের রেকর্ড গড়েছেন। একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দুবার গোল্ডেন বল (২০১৪, ২০২২) জিতেছেন। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে তিনি যেন নিজের ক্যারিয়ারের অসমাপ্ত কবিতার শেষ লাইনটি লিখেছেন।

সেন্টার ফরোয়ার্ড: পেলে (ব্রাজিল)
আক্রমণ ভাগের মাঝখানে ফুটবলের রাজা পেলে ছাড়া আর কে? মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকে চমকে দেওয়া এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি তিনটি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জিতেছেন— যা আজও অনন্য। ক্যারিয়ারে এক হাজারের বেশি গোল করা পেলে শুধু ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবলের বৈশ্বিক মুখ।

লেফট উইং: রোনালদো নাজারিও (ব্রাজিল)
পেলের বাম পাশে রোনালদো নাজারিও। ‘ও ফেনোমেনো’ বলে যিনি আজও ইতিহাসে খ্যাত। ভয়ংকর গতি, অবিশ্বাস্য ফিনিশিং আর ডিফেন্ডারদের অসহায় করে দেওয়ার ক্ষমতায় তিনি ছিলেন অনন্য। বিশ্বকাপে ১৫ গোল করে একসময় সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছিলেন। ২০০২ সালের ফাইনালে তার দুই গোল আজও ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত।

এই একাদশ শুধু ১১ জন ফুটবলারের সমষ্টি নয়। এটি ফুটবলের শত বছরের সৌন্দর্য, আবেগ, শিল্প আর মহিমার প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিটি নামই একেকটি যুগ, একেকটি বিপ্লব, একেকটি স্বপ্নের আরেক নাম।