নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ থাকার কারণে ৬২ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন বলে জানান বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেল ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত 'বতর্মান সরকারের ছয় মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা' শীর্ষক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন ড. দেবপ্রিয়।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব ইতিবাচক ছিল না। ফলে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল অবস্থায় ছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে সরকারের একটি বড় দুর্বলতা হলো দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত দলিল তৈরি না করা।
দু’মাস পেছাল এসএসসি পরীক্ষা, শুরু মার্চের মাঝামাঝি
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো বলেন, সরকার বারবার বলছে তারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, তার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সিপিডি। জানুয়ারি-আগস্ট সময়কালে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১,৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
গ্যাস-ফ্রি সনদ নিয়েও ১০ শ্রমিকের মৃত্যু, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ঘেরাও
এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১,১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১,১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫.৬% থেকে কমে ঋণাত্মক ০.১% হয়েছে।
সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১% থেকে কমে ৮.৩% হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩% থেকে নেমে ৭.২% হয়েছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১% থেকে ৮.২% হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক।
সিপিডির মূল্যায়নে সরকারের কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজির বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫% ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও উপস্থিত ছিলেন।
—জা. অর্থনীতি/এনজে