সিলেটে পতিত জমিতে বাড়ছে আবাদ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

সিলেট প্রতিনিধি: সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে থাকা জমি চাষের আওতায় আনতে সেচ সম্প্রসারণে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সেচ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি খাল-নালা ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন এবং সৌরচালিত পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পতিত জমি আবাদে আসার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সিলেটের প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মৌসুমে অনাবাদি পড়ে থাকে। এসব জমির মধ্যে ধাপে ধাপে ১৭ হাজার হেক্টরকে সেচের আওতায় এনে চাষাবাদ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বিএডিসি। এরই মধ্যে গত মৌসুমে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছেছে। পাশাপাশি বিভাগের ৫০০টি ডিজেলচালিত পাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিলেটের কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনাই বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকটে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। এ অবস্থায় বর্ষার পানি সংরক্ষণ, অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে সংরক্ষিত পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিএডিসির ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন এলাকায় খাল, নালা ও পাহাড়ি ছড়া খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব জলাধারের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বর্ষার পানি ধরে রাখা হবে। পরে সেই পানি সেচকাজে ব্যবহার করা হবে। এতে একদিকে হাওরের পানি নিষ্কাশন সহজ হবে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচের চাহিদাও মেটানো সম্ভব হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, খাল-নালা ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কারের মাধ্যমে বোরো মৌসুমে আট হাজার ১৫০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার ক্ষতি কমাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মধ্যমাকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আরও এক হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। হাওরের কৃষকদের উৎপাদন-পরবর্তী সুবিধা বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। ধান মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর জন্য প্রেসিং ফ্লোর এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে গোপাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিজেলচালিত পাম্পের জ্বালানি ব্যয় ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে ৫০০টি পাম্প সৌরচালিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌর পাম্প চালু হলে জ্বালানি ব্যয় কমার পাশাপাশি ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিও কমবে।

সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তাবিত সৌর সেচ প্রকল্পের গড় সাশ্রয়ের হিসাব অনুযায়ী, সিলেটের ৫০০ পাম্প সৌরচালিত হলে বছরে প্রায় ২৬২ টন ডিজেল এবং তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকা জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকৃত সাশ্রয় পাম্পের ক্ষমতা ও ব্যবহারকাল অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, অনাবাদি জমি আবাদে আনতে শুধু সেচ সুবিধাই যথেষ্ট নয়। সার-বীজের সহজলভ্যতা, কৃষিঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব সহায়তা একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে পতিত জমি চাষে কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলাবদ্ধতা, সেচের সীমাবদ্ধতা, শ্রমিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় ও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ নানা কারণে অনেক কৃষক জমি চাষে আগ্রহ হারান। এসব সমস্যা দূর করা গেলে অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে কৃষির পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা, উন্নত জাত ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধকরণ, প্রদর্শনী প্লট এবং কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পতিত জমি আবাদে এলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে শাকসবজি, ডাল ও তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানো গেলে বাইরের অঞ্চল থেকে এসব পণ্যের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।

এ ব্যাপারে বিএডিসি সিলেট বিভাগের সেচ প্রকল্প পরিচালক প্রণজিত কুমার দেব বলেন, “সিলেট বিভাগে বিভিন্ন মৌসুমে প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকে। এসব জমি চাষের আওতায় আনতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।”

তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে বাকি জমিও সেচের আওতায় আনা হবে। খাল খনন ও সেচ অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সৌর পাম্প স্থাপনের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেটের কৃষির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সেচ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনাবাদি জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সিলেটের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি