জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একসময় একটা চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দেই বুক ধড়ফড় করত-প্রিয়জনের চিঠি এসেছে কি না! কিন্তু মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে সেই অপেক্ষার গল্প।
চিঠি কমেছে। তবে ডাকঘর হারিয়ে যায়নি। বরং চিঠির জায়গা দখল করে ডাক বিভাগ এখন ঢুকেছে টাকা লেনদেন, সঞ্চয়, পার্সেল আর ই-কমার্সের অর্থনীতিতে।
প্রতি বছর ৯ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব ডাক দিবস। ১৮৭৪ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডের বার্নে ২২টি দেশ Treaty of Bern-এ স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে General Postal Union। পরে ১৮৭৮ সালে নাম হয় Universal Postal Union—UPU।
আর ১৯৬৯ সালের টোকিও কংগ্রেসে ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
উদ্দেশ্য শুধু চিঠির ইতিহাস মনে করা নয়; মানুষের জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডাক ব্যবস্থার ভূমিকা তুলে ধরা।
বাংলাদেশেও ডাক বিভাগের চেহারা বদলেছে। সরকারি তথ্য বলছে, ডাক বিভাগের সেবার মধ্যে রয়েছে সাধারণ ও নিবন্ধিত চিঠি, জিইপি, EMS, পার্সেল এবং ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস-EMTS।
এর পাশাপাশি রয়েছে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, ডাক জীবন বীমা ও প্রাইজ বন্ডের মতো আর্থিক সেবা।
অর্থাৎ, ডাকঘর এখন শুধু খবর পৌঁছে দেয় না-মানুষের সঞ্চয়, অর্থ লেনদেন ও ব্যবসার প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত।
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ হাজার ৮১১টি পোস্ট অফিসে এই সেবা চালু রয়েছে।
দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে টাকা পাঠানোর এই ব্যবস্থা ডাক বিভাগের আর্থিক সেবার অন্যতম অংশ। তবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিস্তারের পর প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
তাই ডাক বিভাগের সামনে এখন বড় প্রশ্ন- পুরোনো অবকাঠামোকে কীভাবে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়?
সেই প্রশ্নের একটি নতুন উত্তর-স্পিডপোস্ট। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আলোচনায় আসে ডাক বিভাগের নতুন এই পার্সেল সেবা।
ঢাকা থেকে জেলা শহরে ২৪ ঘণ্টা, এক জেলা থেকে অন্য জেলা শহরে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় সময় আরও বেশি লাগতে পারে-ডাক বিভাগের ঘোষিত সেবার কাঠামোতে এমন সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
এখানেই অর্থনীতির বড় সম্ভাবনা। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অনলাইনে মধু বিক্রি করছেন।কেউ পাঠাচ্ছেন শুকনো খাবার। কেউ আবার নিজের তৈরি পণ্য। তাদের জন্য পৌঁছে দেয়ার খরচ ব্যবসার বড় ব্যয়।
কম খরচে পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বাজার বাড়তে পারে, আর প্রান্তিক এলাকার পণ্যও পৌঁছাতে পারে নতুন ক্রেতার কাছে। আর শুধু কম খরচ নয়-ডাক বিভাগ পার্সেল সেবায় প্রযুক্তিও যুক্ত করছে।
বর্তমানে অনলাইনে পার্সেল ট্র্যাকিং ও মাশুল ক্যালকুলেটরের সুবিধা রয়েছে। ঢাকা জিপিওর সেবার তালিকাতেও স্পিড পোস্ট, ডিজিটাল কমার্স, পার্সেল এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ট্র্যাকিং সুবিধা রয়েছে।
দেশব্যাপী বিস্তৃত ডাক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে এই সেবাকে আরও বড় করা গেলে ডাকঘর হয়ে উঠতে পারে ডিজিটাল অর্থনীতির শেষ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
চিঠির সেই আবেগ হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজন বদলায়নি। শুধু বদলেছে তার ঠিকানা- চিঠি থেকে পার্সেলে, ডাকবাক্স থেকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে, আর যোগাযোগ থেকে অর্থনীতির নতুন সংযোগে।
বিশ্ব ডাক দিবসে তাই প্রশ্ন- ডাকঘর কি এবার চিঠির স্মৃতি পেরিয়ে ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন ঠিকানা হতে পারবে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি