গরিবের ব্যাংক থেকে বড়লোকের ব্যাংক?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

বহু বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের আস্থা ছিল যে ব্যাংকিং সেবা, সেখানে এবার ঘটতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, বিখ্যাত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক নাকি বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাচ্ছে। তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আসল খবর হলো, তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে না, বরং তাদের ব্যবসার ধরনে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ব্যাংকটি তাদের সাধারণ গ্রাহক সেবা বা ‘রিটেইল ব্যাংকিং’ বিভাগটি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রিটেইল ব্যাংকিং বলতে বোঝায়-আমজনতার সঞ্চয়ী হিসাব, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ এবং এটিএম বুথের দৈনন্দিন পরিষেবা। যার সার্বিক ব্যবসার আর্থিক মূল্য সাড়ে আট হাজার কোটি টাকারও বেশি! দেশের ছয়টি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র-ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে শাখা ছড়িয়ে থাকা এবং ইপিজেডের অভ্যন্তরে বিশেষ অফশোর সুবিধা পরিচালনা করা এই ব্যাংকটির ২৬টি শাখা ও ৯৭টি এটিএম থেকে সেবা নেওয়া সাধারণ গ্রাহকরা তাই এখন কৌতূহলী।

তাহলে এই বিশাল আমানত ছেড়ে তারা কোন পথে হাঁটছে? ব্যাংকটির আসল পরিকল্পনা হলো, সাধারণ গ্রাহকদের পর্ব চুকিয়ে তারা এখন কেবল বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক সংস্থা এবং বিপুল সম্পদশালী ব্যক্তিদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে। ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক ধকল সামলাতেই তাদের এই পদক্ষেপ। বর্তমান যুগে সাধারণ গ্রাহকদের ছোট ছোট অ্যাকাউন্ট সামলাতে গিয়ে বিশাল প্রশাসনিক ব্যয়, কঠোর তদারকি ও আন্তর্জাতিক অর্থপাচার প্রতিরোধের কড়াকড়ি সামাল দিতে হয়, যেখানে অর্জিত মুনাফা অত্যন্ত সীমিত।

এই কৌশল কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ধারায় একদম নতুন নয়। একই অর্থনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা, ভারত, জর্ডান এবং কাজাখস্তানের মতো দেশগুলোতেও তারা সাধারণ গ্রাহক সেবা ইতিমধ্যেই গুটিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া কিছু দিন আগেই অন্য আরেক বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি-ও বাংলাদেশে তাদের রিটেইল সেবা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনার ব্যাংক ডেস্কে থাকা সঞ্চয় বা কার্ডের ভবিষ্যৎ কী? আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ আপনার আমানত পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে। সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার এই বিশাল পোর্টফোলিও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্র্যাক ব্যাংক ও দ্য সিটি ব্যাংকের মতো প্রথম সারির দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে দরকষাকষি চলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সম্পন্ন হবে যেন কর্মীদের কর্মসংস্থান ও গ্রাহকের নিরবচ্ছিন্ন সেবা সুরক্ষিত থাকে। অতীতে নব্বইয়ের দশকে বিসিসিআই ব্যাংকের গ্রাহকদের ইবিএল যেভাবে স্থানান্তরিত করেছিল, ঠিক একইভাবে এই মালিকানা পরিবর্তন কেবল খাতা-কলমেই ঘটবে।

মূল কথা দাঁড়িয়েছে, ১২০ বছরের পুরোনো এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি ছোট গ্রাহকদের সেবা দেওয়া বন্ধ করে নিজেদের কেবল উচ্চবিত্তের ব্যাংকে রূপান্তরিত করছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়, আন্তর্জাতিক মানের যে তদারকি ও সেবার ওপর সাধারণ মানুষ আস্থা রেখেছিল, নতুন স্ব দেশীয় ব্যবস্থাপনা কি গ্রাহকদের সেই আগের সমমানের সেবা দিতে সমর্থ হবে?

বিদেশি ব্যাংকে হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?

আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো কি সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরে আসছে? ভারত ও শ্রীলঙ্কার পর এবার বাংলাদেশেও রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। তবে এতে আপনার জমানো টাকা নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই, কারণ ব্র্যাক বা সিটি ব্যাংকের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো এই পোর্টফোলিও কিনে নিচ্ছে। মূলত বড় কর্পোরেট ও শত কোটি টাকার খাতেই বেশি লাভ থাকায় এই পরিবর্তন। ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই নতুন দিক পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আপনার ক্রেডিট কার্ড ও সেভিংস অ্যাকাউন্টের ভবিষ্যৎ কী?

যদি শোনেন দেশের সবচেয়ে পুরোনো বিদেশি ব্যাংক তাদের সাধারণ সেবা বন্ধ করছে, তবে আপনার অ্যাকাউন্টের কী হবে? স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার রিটেইল বিভাগ বিক্রি করে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে এই আমানত ও লোন হস্তান্তরিত হবে নিরাপদ অন্য ব্যাংকে।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো এখন ছোট খাতের জটিলতা এড়িয়ে কেবল বৃহৎ ব্যবসায় নজর দিচ্ছে। দেশী ব্যাংকে হস্তান্তরের পর কি সেবার মান আগের মতো থাকবে?  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি