জাতীয় অর্থনীতি অনলাইন: সৌদি আরবে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশটি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস। পাশাপাশি শ্রম অভিবাসন, ভ্রমণ এবং হজ-ওমরাহ যাত্রার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দেশটির বিমান চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে বাংলাদেশেও বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে।
সর্বশেষ ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০৯ জন। সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরটিতে পাঁচবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ফ্লাইট ওঠানামাও ব্যাহত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট অবতরণ বন্ধ থাকায় অন্যান্য এয়ারলাইনসের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের গুরুত্ব শুধু বিমান যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, সৌদি আরব বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। হজ ও ওমরাহ পালনের জন্যও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি দেশটিতে যান। জেদ্দা ও মদিনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। গত আগস্টে দুই দেশ সাপ্তাহিক সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইটের সংখ্যা ৪৯ থেকে বাড়িয়ে ৮৪ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।
তবে ফ্লাইট চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। অনেক অভিবাসীকে ভিসা ও নিয়োগকর্তার শর্ত মেনে চলতে হয়। কেউ কেউ যাত্রার আগেই অস্থায়ী আবাসনের ভাড়া পরিশোধ করেন। ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হলে তাঁদের অতিরিক্ত ব্যয় ও অন্যান্য সমস্যায় পড়তে হয়।
নিরাপত্তাঝুঁকি শুধু রিয়াদে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, শনিবার গভীর রাতে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও হামলা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হওয়ায় ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমাকে হামলার ঝুঁকিতে থাকার কথা জানিয়েছেন। এর ফলে দেশটির আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
৯ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) সৌদি আরবের আকাশসীমা নিয়ে সতর্কতা বাড়িয়ে এয়ারলাইনসগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে, ওপিএসগ্রুপ তাদের সদস্যদের সৌদি আরবের পুরো আকাশসীমা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিংয়ের তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-সৌদি রুটে বিলম্ব, বাতিল ও গতিপথ পরিবর্তনের ঘটনা দেখা গেছে। ৬ অক্টোবর ঢাকা থেকে জেদ্দাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট গতিপথ পরিবর্তন করে মদিনায় অবতরণ করেছিল। তবে এসব ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার, যাত্রীদের নতুন ফ্লাইটের ব্যবস্থা, সাময়িক আবাসন-সহায়তা এবং নিয়মিত তথ্য সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তনে জ্বালানি ব্যয়, উড়োজাহাজের সময়সূচি ও ক্রুদের কর্মঘণ্টার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন, রেমিট্যান্স এবং আকাশপথের যোগাযোগের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইনসগুলোর সমন্বয় এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
—জা.অর্থনীতি/আরএস