৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, একে একে বিক্রি হচ্ছে হাবিব গ্রুপের সম্পদ! (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা! অথচ সেই ঋণ পরিশোধের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উল্টো একে একে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বাড়ি, জমি, এমনকি কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতিও। চট্টগ্রামের পরিচিত শিল্পগোষ্ঠী হাবিব গ্রুপকে ঘিরে এমন তথ্য সামনে আসার পর ঋণ আদায় নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন পাওনাদার ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা।

ব্যাংক ও গ্রুপসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হাবিব গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেনা হাবিব স্টিলসের। ১৪টি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। রিজেন্ট এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের কাছে আট ব্যাংকের পাওনা ৪৪৪ কোটি টাকা।

 

এ ছাড়া ডায়মন্ড সিমেন্টের ৪০৯ কোটি, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের ৩৫০ কোটি, লিগ্যাসি ফ্যাশনের ৩৩৪ কোটি এবং রিজেন্ট স্পিনিং মিলসের কাছে ৩০২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর দেনাও কয়েক কোটি থেকে দুই শতাধিক কোটি টাকা পর্যন্ত। তবে মোট বকেয়ার কত অংশ খেলাপি ঋণ, তার পৃথক হিসাব পাওয়া যায়নি।

শুধু ব্যাংক নয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও পক্ষের কাছেও বিপুল অঙ্কের দায় রয়েছে গ্রুপটির। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পাওনা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনাদায়ী পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। নাহিদ কটন মিলসের পাওনা ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবসার ২০ জন পাইলটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও গ্রুপটির কাছে টাকা পাবেন।

এদিকে ঋণের চাপের মধ্যেই সম্পদ বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের পর হাবিব শেয়ার অ্যান্ড সিকিউরিটিজ বিক্রি করা হয়। এরপর গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের পাশের ছয় কাঠা জমিও বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রামের চকবাজারের জয়নগরে গ্রুপের দুটি বাড়ি বিক্রির তথ্যও নিশ্চিত করেছেন গ্রুপের এক কর্মকর্তা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি দুটি কিনেছেন আবুল খায়ের গ্রুপের এক পরিচালক।

এ ছাড়া আনোয়ারা পেপার মিলস ও পোশাক কারখানার যন্ত্রপাতিও বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করা হয়েছে। গ্রুপের ওই কর্মকর্তার দাবি, কিছু কারখানার জমি ও ভবন এখনো রয়েছে, তবে যন্ত্রপাতি আগেই বিক্রি করা হয়েছে।

তবে এসব সম্পদ ব্যাংকের কাছে বন্ধক ছিল কি না, কিংবা বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋণের কোনো অংশ পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্পদ বিক্রির অর্থ বিদেশে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়েও গ্রুপের পক্ষ থেকে সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গ্রুপটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবিব জানিয়েছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান চালুর চেষ্টা করেও তারা সফল হননি। তাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। তবে সম্পদ বিক্রি এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

অন্যদিকে শাহজালাল ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, জাহাজভাঙা ও উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবসায় লোকসানের কথা জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করছে না হাবিব গ্রুপ। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর আগে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হাবিব গ্রুপের পাঁচ পরিচালক ইয়াকুব আলী, ইয়াসিন আলী, মাশরুফ হাবিব, সালমান হাবিব ও তানভীর হাবিবের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে গ্রুপসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এর আগের মাসেই তারা দেশ ছেড়েছিলেন। ইয়াকুব আলী পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইয়াসিন আলী পরিবার নিয়ে দুবাইয়ে রয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। যদিও তাদের দেশ ছাড়ার সময় ও বর্তমান অবস্থান স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

সব মিলিয়ে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ, একের পর এক সম্পদ বিক্রি এবং ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তা-সবকিছু মিলিয়ে হাবিব গ্রুপকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় আর্থিক উদ্বেগ। এখন প্রশ্ন, বিক্রি হওয়া সম্পদের অর্থ কোথায় গেল, আর ব্যাংক ও অন্যান্য পাওনাদারদের বিপুল অর্থ কীভাবে আদায় হবে?

—জা. অর্থনীতি/এলএটি