অনলাইন ডেস্ক: ফ্রান্সজুড়ে এখন তুমুল উত্তাপ। সাধারণ কোনো প্রতিবাদ নয়, রীতিমতো রাস্তায় নেমে এসেছে হাজার হাজার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী। দেশের বিভিন্ন শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন উত্তাল। বিদ্যালয়ের ফটকে তালা, রাস্তায় আগুন, আর ক্ষণে ক্ষণে পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশজুড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ কেন এভাবে ফুঁসে উঠল শান্ত ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্ম?
ঘটনার সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর। প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেই অঞ্চলের একটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম প্রতিবাদের সুর ওঠে। শিক্ষার্থীদের মূল ক্ষোভ ছিল চরম শিক্ষক সংকট নিয়ে। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, অথচ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ক্লাসের বোঝা। এতে তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের করুণ অবস্থা। অনেক স্কুলেই ন্যূনতম শিক্ষার পরিবেশ নেই। এই সংকট দূর করতে এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের দাবিতে শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে।
প্যারিস থেকে শুরু হওয়া এই ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো ফ্রান্সে। সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অন্তত ১৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিদ্যালয় অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রবেশপথে ব্যারিকেড দেয়। কোথাও কোথাও রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাসবোমা ও লাঠিচার্জ করলে শুরু হয় সংঘাত। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আলপ-মারিতিম অঞ্চলেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ জন শিক্ষার্থীকে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন আর শুধু স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রূপ নিয়েছে ভয়াবহ রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকুরনু ও কট্টর-বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলেনশো মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের দাবি শোনা হতে পারে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, বিরোধী নেতা মেলেনশো সরকারের কঠোর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তরুণদের ওপর কোনো রকম আঘাত সহ্য করা হবে না। তিনি সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে সমর্থকদের আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যে বর্ণবাদী প্রবণতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর পাল্টা বক্তব্য, এমন অভিযোগ রাষ্ট্র ও পুলিশের জন্য অপমানজনক।
আসলে এই আন্দোলনের আড়ালে রয়েছে ফ্রান্সের গভীর অর্থনৈতিক সংকট। দেশটির সরকারি ঋণ রেকর্ড ছুঁয়েছে-প্রায় ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা মোট অর্থনীতির প্রায় ১১৯ শতাংশ। সরকার বাধ্য হয়ে বাজেট কাটছাঁট করছে, যার কোপ পড়েছে শিক্ষা খাতে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
সামনেই ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ আর নতুন করে প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা দখলের লড়াই এখনই জমে উঠেছে। বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে পুঁজি করে রাজপথ গরম করছে। শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষা আন্দোলন এখন ফরাসি রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বড় এক ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্সে তুলকালাম! রাজপথে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংঘাত!
আগুনে জ্বলছে ফ্রান্সের রাজপথ! ক্লাসরুম ছেড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নেমে এসেছে রাস্তায়। ১৮০টির বেশি স্কুলে তালা, পুলিশের ওপর হামলা এবং মুহূর্তেই রণক্ষেত্র পুরো শহর। শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ ভবন আর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপে ফুঁসে উঠেছে ফরাসি তরুণরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কিন্তু আন্দোলন থামছেই না। শান্ত ফ্রান্সে হঠাৎ কীসের এই আগুন?
স্কুল থেকে রাজপথ, ফ্রান্সে কেন এই বিক্ষোভ?
ফ্রান্সের শিক্ষা আন্দোলন কি তবে কেবলই একটা উসিলা? এর পেছনে লুকিয়ে আছে বিশাল এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝড়। দেশের ঋণ এখন আকাশছোঁয়া, বাজেট কাটছাঁটের কারণে ক্ষুব্ধ গোটা দেশ। তার ওপর সামনেই ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিরোধীদের উসকানি, আর বিরোধীরা বলছে সরকারের জুলুম। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পেছনে আসলে কার হাত রয়েছে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি