আইন যখন মায়ের ঢাল ও মানবিক বাংলাদেশ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

রফিকুল ইসলাম

সৃষ্টির শুরু থেকে মাতৃত্ব এক সর্বজনীন ও শাশ্বত মর্যাদার আসন অধিকার করে আছে। কিন্তু বর্তমান আধুনিক ও যান্ত্রিক সমাজে অনেক সময় পরম শ্রদ্ধার এই জায়গাটি চরম অবহেলা আর নিষ্ঠুরতার শিকার হয়।

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা পরিমাপ করা যায় তার দুর্বলতম নাগরিকের অধিকার প্রাপ্তির খতিয়ান দেখে। আর একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা চেনা যায় তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার চোখের জলের মূল্যায়নে। 

সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ সাগর হোসেন এবং তার বৃদ্ধ মা মুন্নি খাতুনের জীবনের টানাপোড়েন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের বিচ্ছিন্ন সংকট নয়; এটি আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত দলিল এবং একই সাথে দেশের বিচার ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

মায়ের ন্যায্য অধিকার, আইনের শাসনের সঠিক প্রয়োগ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজ এক গভীর আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের শত সহস্র সাধারণ নারীর মতোই একজন মুন্নি খাতুন। জীবনভর দুঃখ-কষ্টের পাথারে সাঁতার কেটে, নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে পরম মায়ায় বড় করেছিলেন একমাত্র সন্তান সাগর হোসেনকে। ছেলে আজ সরকারি ব্যবস্থার একেবারে তৃণমূলের প্রতিনিধি—ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে মা ছেলেকে পৃথিবীর আলো দেখালেন, সমাজের বুকে দাঁড় করালেন, সেই ছেলের ঘরেই মায়ের জন্য এক বর্গফুট জায়গার সংস্থান হলো না।

মা চেয়েছিলেন সন্তানের কাছে একটু আশ্রয়, একটু মায়া। কিন্তু ছেলে সাগর মাকে নিজের ঘরে রেখে ভরণপোষণ দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন। এমনকি মাকে কাছে রাখার দাবি তুললে তিনি আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত দেন- যা একজন জন্মদাত্রী মায়ের বুকে তপ্ত শেলের মতো বিঁধেছিল। নিরুপায় মা শেষ পর্যন্ত সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরে হাজির হয়ে একটি লিখিত আকুতি জমা দেন।

এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো দেশের মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। সেই ভিডিয়োতে কান্নায় ভেঙে পড়া মায়ের একটি বাক্য দেশের কোটি মানুষের হৃদয়কে রক্তাক্ত করেছে - “ছেলের সাথে নুন-পান্তা খেয়ে হলেও ওর ঘরেই পড়ে থাকতে চাই।” 

এই একটি লাইনেই স্পষ্ট হয়ে যায়- একজন বাঙালি মা সন্তানের কাছে কোনো রাজকীয় বিলাসিতা চান না; তিনি চান কেবল সন্তানের হাতের স্পর্শ, একটুখানি মমতার ছায়া।

ঘটনাটি যখন সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরে পৌঁছায়, তখন দেশের প্রচলিত আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে বিষয়টির তাৎক্ষণিক আইনি সমাধান করার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রশাসন বিষয়টি আইনের কাঠামোর মধ্যে না এনে পাবনা পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী ডা. আহমেদ মোস্তফা নোমানের মতো একজন রাজনৈতিক নেতার ওপর ছেড়ে দেয়। সেই নেতা বৃদ্ধার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিলে প্রশাসন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে!

নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক নেতার এই প্রস্তাব মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইনি অধিকারকে কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক করুণা বা দাতব্যের সমার্থক বানানো যায় না। মুন্নি খাতুন কোনো রাজনৈতিক নেতার দয়ার পাত্রী হতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন তার নিজের পেটের সন্তানের কাছে তার ন্যায্য ও আইনি অধিকার। 

কিন্তু প্রশাসনের এই দায়িত্ব এড়িয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা এক ধরনের বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের মাঠ প্রশাসন অনেক সময় জটিলতা এড়াতে শর্টকাট বা সমঝোতার পথ খুঁজে, যা ভুক্তভোগীর অধিকারকে আরও বেশি খাটো করে। এছাড়া এতে প্রশাসনের বিচ্যুতির চিত্রও ফুটে ওঠে।

যখন রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসন এক মায়ের অধিকারকে দাতব্যের মোড়কে ঢাকতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আশার আলো নিয়ে হাজির হয় এ দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগ। 

গত ৮ অক্টোবর বৃদ্ধ মা মুন্নি খাতুন ও তার ছেলে সাগর হোসেনের মধ্যকার অমানবিকতা, অবজ্ঞা ও নিষ্ঠুরতা; অপরদিকে প্রশাসনের বিচ্যুতির চিত্রের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তা পাবনা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাঁথিয়া থানার আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে আদালত মুহূর্তের জন্যেও কালক্ষেপণ করেননি।

কোনো আনুষ্ঠানিক মামলার অপেক্ষা না করে, বিজ্ঞ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে সাঁথিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিসুর রহমানকে নির্দেশ দেন অভিযুক্ত ছেলে সাগর ও ভুক্তভোগী মাকে আদালতে হাজির করতে। 

সেইমতে গত ১১ অক্টোবর বিকেলে ওসির নিজস্ব গাড়িতে করে মা ও ছেলেকে বিজ্ঞ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের সেই কক্ষটি তখন আর কেবল আইনি মারপ্যাঁচের চার দেয়াল ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল মানবিকতার এক পরম পাঠশালা। বিজ্ঞ বিচারকের তীক্ষ্ণ অথচ সংবেদনশীল জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ভেঙে পড়ে ছেলে সাগর হোসেনের ঔদ্ধত্য। 

আইনের কঠোরতা এবং মায়ের প্রতি কর্তব্যের অবহেলার আইনি পরিণতি বুঝতে পেরে প্রকাশ্য আদালতে মায়ের পা ধরে ক্ষমা চায় সে। সেইসাথে দেশবাসীর কাছে নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, মাকে নিজের ঘরে পরম যত্নে আগলে রাখবেন। 

বিজ্ঞ আদালতের এই সুদৃঢ় হস্তক্ষেপে মুন্নি খাতুন কোনো নেতার দয়ায় নয়, বরং নিজের সন্তানের ঘরে সগৌরবে ফিরে যান। এখানে দৃশ্যত ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’-এর প্রকৃত সার্থকতা ও কার্যকারিতা প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে পাস হওয়া 'পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি' এক যুগান্তকারী আইনি সংস্কার। আইনটিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে- কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে বা আলাদা রাখতে পারবে না। সন্তানদের অবশ্যই পিতা-মাতার নিয়মিত চিকিৎসাসেবা, অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আইন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার পেছনে যদি বিচারিক সদিচ্ছা এবং তদারকি না থাকে, তবে তা কেবলই কাগজের পাতায় বন্দি একরাশ শব্দ ছাড়া আর কিছুই নয়। সাঁথিয়ার আমলি ম্যাজিস্ট্রেট যেভাবে স্বপ্রণোদিত হয়ে এই আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, তা দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা আদালতের জন্য একটি মাইলফলক বা ‘প্রিসিডেন্ট’ হয়ে থাকবে।

সাগর হোসেন সমাজের কোনো অশিক্ষিত বা প্রান্তিক স্তরের মানুষ নন; তিনি স্থানীয় সরকারের একজন অংশ, একজন গ্রাম পুলিশ। যার দায়িত্ব সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সেই মানুষের ঘরের শান্তিশৃঙ্খলা এবং নৈতিকতার এই দশা আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক মূল্যবোধের ওপর এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

আজকের দিনে অনেক সন্তানই পিতা-মাতাকে নিজের জীবনের গতিপথের অন্তরায় মনে করে। আধুনিকতার নামে, একক পরিবারের মোহে বৃদ্ধ বাবা-মাকে ফেলে আসা হচ্ছে অন্ধকার ঘরের কোণে কিংবা কোনো দূরবর্তী বৃদ্ধাশ্রমে। অনেকে ভাবেন, প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেই বুঝি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। 

মুন্নি খাতুনের এই ঘটনা সেই সমস্ত আধুনিক ও আত্মকেন্দ্রিক সন্তানদের মুখে এক সজোরে চপেটাঘাত। মা-বাবা কোনো অঙ্কের হিসাব নন; তারা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নন যে টাকা দিয়ে তাদের জীবনের শূন্যতা পূরণ করা যাবে। তারা চান একটু পরম নির্ভরতা, একটু কথা বলা আর শেষ বয়সে নিজের সন্তানের চোখের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার অধিকার।

পাবনার সাঁথিয়ার মুন্নি খাতুন আজ তার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। তিনি আজ ছেলের ঘরে ফিরে গেছেন বিজয়ী বেশে। কিন্তু আমাদের চারপাশে আর কত শত মুন্নি খাতুন লোকলজ্জার ভয়ে কিংবা আইনের দুয়ারে পৌঁছাতে না পেরে নীরবে চোখের জল ফেলছেন, তার হিসাব কি রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে আছে?

এই ঘটনার প্রধান শিক্ষা হলো- মানবিক সংকটগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বা প্রচারণার মাধ্যমে সমাধান না করে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে, যেন কোনো ভুক্তভোগীকে বিচার পেতে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ভাইরালের অপেক্ষায় থাকতে না হয়।

পাবনার বিজ্ঞ আদালত যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা দেশের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ুক। কোনো মা যেন কোনো নেতার করুণার পাত্রী না হন, কোনো বাবাকে যেন অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকতে না হয়। সন্তানের ঘরের নুন-পান্তাই যেন হয় প্রতিটি পিতা-মাতার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্বর্গ। আর প্রতিটি মায়ের ঘর হোক নিরাপদ আশ্রয়।

এই একটি ঘটনার সমাধান যেন আমাদের সমাজ থেকে সব ধরনের অমানবিকতার অবসান ঘটায় - এটাই আজ সময় ও বিবেকের দাবি। রাষ্ট্রের প্রতিটি সন্তান যেন মনে রাখে, মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত নয় শুধু, মায়ের কোলেই সন্তানের সত্যিকারের মানবিক সত্তার বিকাশ ঘটে।

আইনের শাসন ও পারিবারিক নৈতিকতার মেলবন্ধনেই কেবল গড়ে উঠতে পারে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট; সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা